নজরুল বর্ষ উদযাপনের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজন করে বিশেষ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা- নজরুলের “লেটোগান ও কবিগান”। আজ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, সন্ধ্যায় জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা কেন্দ্র মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ‘কাজী নজরুল ইসলামের লেটোগান ও কবিগান: লোকঐতিহ্য, সৃজনশীলতা ও বিদ্রোহী চেতনার উৎসসন্ধান’ শিরোনামে প্রবন্ধ পাঠ করেন সরকারি সংগীত কলেজ-এর লোকসংগীত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ড. কমল খালিদ। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন)। বিশেষ অতিথির বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব মাসুমা রহমান তানি। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত, নৃত্য ও আবৃত্তি বিভাগের পরিচালক জনাব মেহবাজীন রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বলেন, “নজরুলের একটা দিক এখনও খুব বেশি করে আমরা জানি না, সেটা হলো তাঁর কৈশোর। তিনি লেটো গান করতেন, আমরা জানি; কিন্তু লেটো গানটা কী— তা আমরা অনেকে জানি না। কবিগান কীরকম? কিছু কিছু জানি। নজরুলের লেটো গান অসাধারণ বিষয়। তার মধ্যে নাটক থাকে, তার মধ্যে নানা রকম বক্তব্য থাকে। এক দল একটা বক্তব্য উপস্থাপন করে, আরেকটা দল এসে সেটা নিরসন করে। মানুষ খুব কৌতূহল নিয়ে সেটা দেখে। আমরা গবেষণার ভেতর দিয়ে চেষ্টা করেছি ঐ সময়কে তুলে ধরার। ১৮৯৯ সালে নজরুলের জন্ম, তাঁর আট-দশ বছরের মধ্যেই তিনি লেটো গানের দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন বা যাতায়াত শুরু করেছিলেন। এই লেটো দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি গান করতেন। এইজন্য তাঁকে মহাভারত সম্পর্কে জানতে হতো, বেদ সম্পর্কে জানতে হতো, পবিত্র কুরআন সম্পর্কে জানতে হতো। অনেক কিছু জানলেই কেবল লেটো গানের দল নিয়ে লড়াই করা যেত, কবির লড়াই। এটা অনেক দুর্ধর্ষ ব্যাপার, আপনি কোনো ভুল তথ্য দিতে পারবেন না। অর্থাৎ, তাঁর জীবনাচরণের মধ্যে কবিতা এমনভাবে ঢুকে গিয়েছিল যে পরবর্তীকালে তিনি একবারে বসেই অনেক গান রচনা করতে পারতেন। আজ আমরা চেষ্টা করেছি নজরুলের নির্বাচিত লেটো গান— উপস্থাপনের।”
আয়োজনের দ্বিতীয় পর্বে শুরুতেই পরিবেশিত হয় লেটোগান ‘অন্ধরাজা’। পরিচালনা ও রুপায়নে ছিলেন ড. কমল খালিদ। সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন সায়মা আহমেদ লিজা। লেটোগান পরিবেশনায় ছিলেন লেটোগানের দল ‘নিমশা লেটোদল’ ও ‘মেদেনীপুর লেটোদল’। এরপর জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘কবির লড়াই’ পরিবেশনা শুরু হয়। পরিচালনা ও রুপায়নে ছিলেন জীবন চৌধুরী। কবিয়াল জীবনউড়ের সঙ্গে গানে গানে লড়াই করেন কবিয়াল গুমানী বাবু। পরিবশেনায় ছিলেন জীবন চৌধুরী-গুমানী বাবু, বাবুল হোসাইন- জীবনউড়ে, মামুন হোসাইন- সূত্রধর/ কয়ালী। দোহারে ছিলেন শান, সৈয়দ মাসুমুর রহমান, জয়ন্ত বিকাশ দাস, মাহমুদা আক্তার রুপা, আরবী ইসলাম স্বর্ণা, জান্নাত আরা শ্যামলী, অনন্যা রায় ও নারানয় দেব। বাদ্যযন্ত্রে তবলায় তুষার কান্তি সরকার, বাঁশিতে মো: নয়ন, ঢোলে আকাশ কবির এবং খন্জরি, মন্দিরায় মো: সোহেল মিয়া।
ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনার মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হয় নজরুলের সৃষ্টির এক অনন্য লোকায়ত অধ্যায়-যেখানে বাংলার মাটি, মানুষ, হাসি, কান্না, প্রেম, প্রতিবাদ ও জীবনবোধ একাকার হয়ে আছে।