দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর (বিএনকিউএফ) আওতায় প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ইনফরমাল সেক্টরের অধীন ‘টাঙ্গাইল শাড়ি উইভিং (লেভেল-২)’ অকুপেশনের কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড (সিএস) এবং কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন ডকুমেন্ট (সিএডি) ভ্যালিডেশন কর্মশালার সমাপনী অধিবেশন আজ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ)-এর সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ)-এর উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে এনএসডিএ-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান (সচিব) ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী-এর সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব আবু আহমদ ছিদ্দীকী, এনডিসি, চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব), বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড; এবং জনাব মির্জা নুরুল গনি শোভন, চেয়ারম্যান, ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিল (আইএসসি)।
সভাপতির বক্তব্যে ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী বলেন, এনএসডিএ বিভিন্ন আধুনিক ও চাহিদাভিত্তিক পেশার পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্যবাহী ও শ্রমঘন খাতসমূহকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে কাজ করছে। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চাহিদার প্রেক্ষিতে টাঙ্গাইল শাড়ি উইভিং অকুপেশনের জন্য প্রণীত কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড ও কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন ডকুমেন্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ খাতের কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, দক্ষতার স্বীকৃতি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত হবে।
তিনি বলেন, দক্ষতা উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসার লক্ষ্যে এনএসডিএ নীতি প্রণয়ন, কারিকুলাম উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়ন, সনদায়ন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ জোরদারে কাজ করছে। বিগত ১০ মাসে বিভিন্ন খাতে ৮৫টি যুগোপযোগী কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড ও প্রশিক্ষণ কারিকুলাম নতুন প্রণয়ন ও রিভিউ করা হয়েছে। এর মধ্যে জামদানি ও টাঙ্গাইল শাড়ির মতো ঐতিহ্যবাহী পেশার জন্যও মানসম্মত প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
তিনি আরও বলেন, শিল্পখাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যে শিল্প দক্ষতা পরিষদসমূহকে আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি আরও সক্রিয় করা হচ্ছে এবং দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে জব প্লেসমেন্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। তিনি জানান, এনএসডিএ’র ট্রেকিং সিস্টেমের মাধ্যমে জানা গেছে জাতীয় দক্ষতা সনদের (এনএসসি) মাধ্যমে ৫৮টি দেশে দক্ষ শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৭০ হাজার সার্টিফিকেটধারীর দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি ২০ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় ভাষাভিত্তিক ও দেশভিত্তিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির সুযোগ সম্প্রসারণে এনএসডিএ বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করছে। সৌদি আরবের তাকামুল, জাপানের টেকনোগ্রাম ও নেক্সাস গ্রুপ এবং অস্ট্রেলিয়ার ট্যাফে ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি (এমআরএ), যৌথ সনদায়ন, ভাষা সহায়তা ও কর্মসংস্থান বিষয়ে সমঝোতা স্মারকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সিঙ্গাপুর ও সৌদি আরবভিত্তিক ছয়টি কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড (সিএস) এবং জাপানি ও ইংরেজি ভাষার কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে এবং এসকল কারিকুলামের আওতায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল ও এনার্জি খাতের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় দক্ষতা কাঠামো উন্নয়ন এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে কাজ চলছে, যা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি করবে। দক্ষতা সনদায়ন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য করতে ডিজিটাল স্বাক্ষর ও কিউআর কোডসম্বলিত জাতীয় দক্ষতা সনদ প্রদানের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জনাব আবু আহমদ ছিদ্দীকী বলেন, তাঁতশিল্প বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিল্পখাত। টাঙ্গাইল শাড়ি উইভিংয়ের জন্য কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন দক্ষ কর্মীদের সক্ষমতা মূল্যায়ন ও স্বীকৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। তিনি বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের আওতাধীন টাঙ্গাইলের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে এনএসডিএ’র অধীনে নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কোর্স চালুর উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানান।
জনাব মির্জা নুরুল গনি শোভন বলেন, ইনফরমাল সেক্টরের কর্মীদের দক্ষতা স্বীকৃতি ও উন্নয়নে সরকার, শিল্পখাত এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ধরনের স্ট্যান্ডার্ড প্রণয়ন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট সেক্টরের প্রতিনিধি, শিল্প-প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, একাডেমিয়া, বিশেষজ্ঞ এবং এনএসডিএ’র কর্মকর্তা, পরামর্শক এবং গণমাধ্যমকর্মীগণ অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় টাঙ্গাইল শাড়ি উইভিং পেশার জন্য প্রণীত সিএস এবং সিএডি পর্যালোচনা ও ভ্যালিডেশন করা হয়। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে ডকুমেন্টসমূহ চূড়ান্তকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়, যা ভবিষ্যতে টাঙ্গাইল শাড়ি শিল্পে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং মানসম্মত প্রশিক্ষণ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।