ডিসিসিআইতে “সবার জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং: আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ব্যবধান দূরীকরণ” বিষয়ক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
ডিসিসিআইতে “সবার জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং: আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ব্যবধান দূরীকরণ” বিষয়ক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৫
তথ্য-প্রযুক্তির বর্তমান সময়ে ডিজিটাল ব্যাংকিং-এর ভালো সম্ভাবনা থাকলেও, সহায়ক নীতিমালার অনুপস্থিতি, ব্যবহারকীরদের আস্থাহীনতা, অপ্রতুল অবকাঠমো, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মূল্যের উচ্চহার প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশ এ সম্ভবানাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে ডিসিসিআই আয়োজিত “সবার জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং: আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ব্যবধান দূরীকরণ” শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভায় অংশগ্রহণকারীবৃন্দ।
উল্লেখ্য, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) অদ্য ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে “সবার জন্য ডিজিটাল ব্যাংকিং: আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ব্যবধান দূরীকরণ” শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনার আয়োজন করে। ডিসিসিআই মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সভায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, এনডিসি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মোঃ এজাজুল ইসলাম যথাক্রমে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে ২০১১ সালে মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস চালু হলেও বর্তমানে দেশের প্রায় ৫৪% মানুষ এ সুবিধা ব্যবহার করছে, যার মাধ্যমে সহজতর ভাবে আর্থিক সেবা প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। তবে সাইবার নিরাপত্তা, ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ এবং আস্থার অভাবের কারণে এখাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। সেই সাথে ডিজিটাল সার্ভিসে আরো সাশ্রয়ী করা, ফিনান্সিয়াল ও ডিজিটাল লিটারেসি বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংক ও ফিনটেক নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যকার সমন্বয় আরো বৃদ্ধির উপর জোরারোপ করেন ডিসিসিআই সভাপতি। তিনি আরো বলেন, আর্থিক ডিজিটাল সেবার সাথে আস্থা ও নিরাপত্তার বিষয়টি ওতোপ্রতোভাবে জড়িত, যার উপর সকলকে গুরুত্বারোপ করতে হবে বলে মত প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরী, এনডিসি বলেন, দেশে ডিজিটাল সেবার আধুনিকায়ন ও নিশ্চিতকরনের জন্য সরকার, বেসরকারিখাত এবং শিক্ষাখাত একই লক্ষ্যে কাজ করছে। তিনি বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থার আধুনিকায়নে অর্ন্তভূক্তি, অভিগম্যতা, একত্রীকরণ এবং বিস্তার-এ চারটি বিষয়ের উপর অধিক হারে গুরুত্ব দিচ্ছে। সচিব আরো বলেন, ডাটা নিবন্ধনের প্রক্রিয়া যথাযথ না হওয়া ৫ কোটি নাগরিকের ডাটা ডার্কওয়েবে পাওয়া গেছে, তাই ডাটা এনক্রিপশনের প্রক্রিয়া যথাযথ হওয়ার পাশাপাশি নজরদারি জোরদার করতে হবে। ডিজিটাল ব্যাংকিং-এর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সহ লোকবল সহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এবং সরকার থেকে যথাযথ নীতি সহায়তা প্রদান করা হবে তিনি আশ্বাস প্রদান করেন। তিনি জানান, নাগরিক সেবা প্রদানের লক্ষ্যে ওয়ান-স্টপ সার্র্ভিসের মাধ্যমে সকল নাগরিক সেবা প্রাপ্তির বিষয় সরকার কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে ঢাকা শহরের ১০টি নাগরিক সেবা চালু হয়েছে। তিনি জানান, সরকার ব্যক্তিগত ডাটা সংরক্ষণ অর্ডিনেন্স করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা আগামী একমাসের মধ্যে সম্পন্ন হবে আশা প্রকাশ করেন।
সভার বিশেষ অতিথি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ডা. মোঃ এজাজুল ইসলাম বলেন, ডেবিট, ক্রেডিট, ডিপোজিট, ইন্স্যুরেন্স এবং পেমেন্ট সার্ভিস প্রভৃতি আর্থিক সেবায় দেশ বহুদূর এগিয়েছে, তবে অধিক সংখ্যক জনগনকে এ ধরনের কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। তিনি জানান, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৩ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি টাকার মানি সার্কুলেশন হয়েছে, যদি ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে সাধারণ জনগনের হাতে রয়েছে ২ লক্ষ ২৭ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকের কাছে রয়েছে মাত্র ২৯ হাজার কোটি টাকা। তিনি আরো জানান, এ যাবত আর্থিক খাতে লেনদেনের ডিজিটাল পেমেন্ট হয়েছে মাত্র ২৭-২৮%, আর বাকী ৭০শতাংশের বেশি প্রথাগত ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়ে থাকে।
এ অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে রবি আজিয়াটা পিএলসি’র হেড অব কমার্শিয়াল পার্টনারশীপ সানজিদ হাসান বলেন, ২০২৫ সালে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলোর ডিজিটিাল ব্যাংকিং খাতে বাজার ৪৬৭৮.৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেটি ২০৩৩ সালে ১১২৩৮.৬ মিলিয়নে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের গতানুগতিক ব্যাংকিং কার্যক্রমের বিষয়ে অনেকের আস্থার অভাব রয়েছে, যেখানে ডিজিটাল কার্যক্রম বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করে। দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং-এর বাজার ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তবে এটাকে নিরাপদ করতে হলে, একটি সমন্বিত ও সাইবার নিরাপত্তা ইকো-সিস্টেম চালু একান্ত আবশ্যক, অন্যথায় বড় ধরনের বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি কার্যক্রম আরো বাড়ানোর উপর প্রতি তিনি জোরারোপ করেন। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের মত প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সুলভে প্রাপ্তির মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক এলাকায় ডিজিটাল সেবা ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে বলে তিনি অভিমত জ্ঞাপন করেন।
এছাড়াও অনুষ্ঠানের নির্ধারিত আলোচনায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)’র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (ডিবি) মোঃ ইলিয়াস জিকো, শান্তা এসেট ম্যানেজেমেন্ট লিমিটেড’র ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ খান, সিটি ব্যাংক পিএলসি’র অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী আজিজুর রহমান, বেটলস্ সাইবার সিকিউরিটি লিমিটেডের চীফ সাইবার অপারেশন্স অফিসার শাহী মির্জা এবং ওমেগা এক্সিম লিমিটেডের পরিচালক রেজওয়ান আলী অংশগ্রহণ করেন।
ডিএমপি’র অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোঃ ইলিয়াস জিকো বলেন, আর্থিক খাতে ডিজিটাল ব্যবস্থার অপব্যবহারের মাধ্যমে অসংখ্য গ্রাহক প্রতারিত হচ্ছেন, তাই মোবাইল ব্যাংকিং কাস্টমার একাউন্ট খোলার পর নবায়নের পদ্ধতি চালুর বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। এছাড়াও আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে গ্রহাকদের নিরপত্তার নিশ্চিয়তার উপর বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তিনি জানান, প্রতিদিন প্রায় ১০-২০ কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে লেনদন হচ্ছে, তাই সকলকে এ ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে।
আরিফ খান বলেন, দেশে ৬৪টি ব্যাংক রয়েছে তারপরও ডিজিটাল ব্যাংক চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি জানান, আর্থিক খাতে ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার কারণে মূলত খেলাপীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, সেই সাথে আর্থিক অনিয়মের বিষয়ের বিচার কার্যক্রমের সংষ্কারের উপর তিনি জোরারোপ করেন।
কাজী আজিজুর রহমান বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ মানুষ এখনও ব্যাংকিং কার্যক্রমের বাইরে রয়েছে, যারা নিজেদের নিকট নগদ জমা রাখে, ফলে এর পরিমাণও বেশ বড়। তিনি বলেন, আমাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান প্রতিবন্ধতকা হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার অনুপস্থিতি। এছাড়াও দেশের প্রথাগত ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল ব্যাংকিং-এর কোন রোডম্যাপ নেই।
রেজওয়ান আলী বলেন, আমাদের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমগুলোর বেশিরভাগই প্রথাগত পদ্ধতি চালিয়ে যাচ্ছি, যদিও এ কার্যক্রমগুলোতে ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় নিয়ে বেশ কষ্টসাধ্য নয়, তবে এগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দে উদ্যোক্তারা পিছিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সাথে এগুলোর সাথে সম্পৃক্ত সংস্থাগুলোকে ব্লকচেইনের আওতায় নিয়ে আসা গেলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
শাহী মির্জা বলেন, এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবহৃত কম্পিউটারের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিতের পাশাপাশি আর্থিক ডিজিটাল সেবা প্রদানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের সাথে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপর জোর দিতে হবে। এছাড়াও দেশব্যাপী ইউনিফাইড সাইবার সিকিউরিটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরির প্রস্তাব করেন।
ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মোঃ সালিম সোলায়মান, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ এবং সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।