দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা এবং টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ ও আধুনিক ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ওমেরা সোলার (ওমেরা রিনিউয়েবলস লিমিটেড)। এ লক্ষ্যে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ৩ ও ৪ নভেম্বর বিদ্যুৎ বিভাগ এবং ইডকলের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬’-এ নিজেদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক মানের সোলার প্যানেল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বিভিন্ন সমাধান প্রদর্শন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
মেলায় ওমেরা সোলারের কার্যক্রম, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন প্রতিষ্ঠানটির বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার কাজী উম্মে জাহান মিশি।
তিনি জানান, ওমেরা সোলার ২০১১ সাল থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান দুটি ক্ষেত্র হলো সোলার ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) সেবা এবং সোলার প্যানেল উৎপাদন। বৃহৎ পরিসরের সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ১২০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতার প্রকল্প সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে আরও প্রায় ৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতার প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৯ সাল থেকে রুফটপ সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে ইঞ্জিনিয়ার কাজী উম্মে জাহান বলেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বর্তমানে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) নিয়েও কাজ করছে ওমেরা সোলার। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে দিনের বেলায় সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ করে রাতে কিংবা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে গ্রাহকরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা পাওয়ার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর নির্ভরশীলতাও কমাতে পারবেন।
তিনি আরও জানান, আধুনিক হাইব্রিড ব্যাটারি সিস্টেম শুধু সৌরবিদ্যুৎ দিয়েই চার্জ করা যায় না, বিদ্যুতের দাম কম থাকা অফ-পিক আওয়ারেও জাতীয় গ্রিড থেকে চার্জ করে রাখা যায়। পরবর্তী সময়ে পিক আওয়ারে, যখন বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক বেশি থাকে, তখন সংরক্ষিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব। বর্তমানে ব্যবহৃত নতুন প্রজন্মের লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির স্থায়িত্ব প্রায় ২০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এসব ব্যাটারি আবাসিক ভবন ও শিল্পকারখানা—উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহারযোগ্য। প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ খরচ সাশ্রয় এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি স্টোরেজের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎসে বিনিয়োগের এখনই উপযুক্ত সময়। বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমবে এবং বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে স্বনির্ভরতা বাড়বে।
ওমেরা সোলারের কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটির আলাদা প্রকল্প বাস্তবায়ন, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ দল রয়েছে। গ্রাহকদের সোলার প্ল্যান্টের কার্যকারিতা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। বিশেষ করে সোলার প্যানেল পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্যানেলে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। গ্রাহকদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠানটি এসব বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে ইঞ্জিনিয়ার কাজী উম্মে জাহান বলেন, ওমেরা সোলার বাংলাদেশে নিজস্ব উৎপাদন কারখানায় মানসম্মত সোলার প্যানেল তৈরি করছে। দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব প্যানেল যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। আবাসিক, শিল্প ও সরকারি—সব ধরনের গ্রাহকের নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা পূরণে প্রতিষ্ঠানটি প্রস্তুত রয়েছে।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের অধীনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সুনাম ও গ্রাহক আস্থার বিষয়ে তিনি বলেন, গ্রুপটির অন্যতম প্রধান নীতি হলো গুণগত মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস না করা। প্রাইম ব্যাংক, ওমেরা সিলিন্ডার, ওমেরা লুব্রিকেন্টস, ওমেরা এলপিজি এবং ওমেরা সোলারসহ গ্রুপের সব প্রতিষ্ঠানই মানসম্মত পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে। পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিই দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে সহায়তা করেছে।
সরকারি সহযোগিতার প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের নীতিগত সহায়তা ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে রূপান্তর অনেকটাই সহজ হয়েছে। শুল্ক ছাড় ও সুবিধাজনক নীতিমালা আমাদের কাজকে আরও গতিশীল করেছে, যার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের সুনাম ও গ্রাহক আস্থা প্রসঙ্গে কাজী উম্মে জাহান জানান, “ইস্ট কোস্ট গ্রুপের নীতি অনুযায়ী আমরা পরিমাণের চেয়ে পণ্য ও সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করাকে (Quality over Quantity) সবসময় অগ্রাধিকার দিয়ে থাকি। এ কারণেই আমাদের সোলার সলিউশন ছাড়াও অন্যান্য সিস্টেমের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা দীর্ঘদিন ধরে বজায় রয়েছে। আমরা আমাদের নিজস্ব প্ল্যান্টে মানসম্মত সোলার প্যানেল তৈরি করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যেও রপ্তানি করছি।”
আবাসিক, শিল্প কিংবা সরকারি—সব ধরনের খাতেই নবায়নযোগ্য শক্তিভিত্তিক সলিউশন দিতে ওমেরা সোলার প্রস্তুত বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, মেলায় ওমেরা সোলারের উৎপাদন সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি কার্যক্রম এবং নতুন প্রজন্মের সোলার প্রযুক্তি নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার খান আশিক রহমান।
তিনি জানান, ওমেরা সোলারের দুটি প্রধান কার্যক্রম হলো সোলার ইপিসি সেবা এবং সোলার প্যানেল উৎপাদন। সাভারের আশুলিয়ায় অবস্থিত নিজস্ব কারখানায় সম্পূর্ণ রোবোটিক ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির মাধ্যমে ৫০ ওয়াট থেকে শুরু করে ৬৩০ ওয়াট পর্যন্ত সক্ষমতার সোলার প্যানেল উৎপাদন করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, ওমেরা সোলারের উৎপাদিত সোলার প্যানেল আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ইউএল (UL), আইইসি (IEC) এবং সিই (CE) সনদপ্রাপ্ত। এসব আন্তর্জাতিক সনদের কারণে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়মিত সোলার প্যানেল রপ্তানি করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বাজারে ব্যবহারের জন্য প্যানেলগুলো স্রেডা অনুমোদিত এবং বিএসটিআই স্বীকৃত। ফলে স্রেডার নেট মিটারিং নীতিমালার আওতায় দেশীয় গ্রাহকরা এসব প্যানেল ব্যবহার করে মানসম্মত সোলার প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ পাচ্ছেন।
মেলায় প্রদর্শিত নতুন প্রজন্মের সোলার প্যানেল সম্পর্কে ইঞ্জিনিয়ার খান আশিক রহমান বলেন, এবার তারা এন-টাইপ টপকন (N-type TOPCon) সেল প্রযুক্তির বাইফেসিয়াল সোলার প্যানেল প্রদর্শন করেছেন। এটি বর্তমানে সোলার শিল্পের অন্যতম আধুনিক প্রযুক্তি। এই প্যানেলের বিশেষত্ব হলো, এর সামনের পাশাপাশি পেছনের অংশ থেকেও সূর্যালোক গ্রহণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। ফলে প্রচলিত প্যানেলের তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ও সামগ্রিক কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়।
দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে চাহিদা ও লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা অর্জনে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ওমেরা সোলার নিজস্ব উৎপাদন, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে চায়।
সরকারের সহযোগিতা ও নীতিগত সহায়তার বিষয়ে ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওমেরা জাহান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগ ও নীতিগত সহযোগিতা এ খাতের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকারের সহযোগিতার ফলে সাধারণ মানুষকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করা এবং এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা সহজ হচ্ছে। শুল্ক ও নীতিগত সুবিধার কারণে বিনিয়োগের প্রাথমিক বাধা কমলে গ্রাহকদের আগ্রহও বাড়বে।
তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে বাংলাদেশকে আরও পরিচ্ছন্ন, পরিবেশবান্ধব ও সবুজ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে ওমেরা সোলার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশ সোলার এক্সপো ২০২৬-এর মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা, গ্রাহক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি সরবরাহকারীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে আধুনিক সোলার প্রযুক্তি ও ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের বিদ্যুৎ খাতের টেকসই উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।