অপসংস্কৃতি ও জীবনবিমুখ ধারা বর্জন করে মেহনতি মানুষের সংগ্রাম ও জাগরণের কথা বলে এমন জীবনমুখী সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ ঘটানোর উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। আজ ঢাকার মালিবাগস্থ স্কাই সিটি হোটেলে ঢাকা কালচারাল একাডেমি কর্তৃক আয়োজিত ‘সুপার সাকসেস অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ (সিজন-৩) অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। যুবসমাজকে মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে রক্ষা, জাতীয় পুঁজির বিকাশ এবং দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মন্ত্রী।
উদ্যোক্তা, নেতৃত্ব, সংস্কৃতি এবং সামাজিক প্রভাবের মতো বহুমাত্রিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান ও শ্রেষ্ঠত্ব উদযাপনের লক্ষ্য নিয়ে আজ অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে এই মর্যাদাপূর্ণ অ্যাওয়ার্ড প্রোগ্রামটি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় উদ্যোক্তা, স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, চিকিৎসক, সমাজসেবক ও মিডিয়া প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানটির মিডিয়া ও ব্র্যান্ডিং পার্টনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে উইকসো গ্লোবাল সলিউশনস (WiQxo Global Solutions)। এছাড়া স্পন্সর ও পার্টনার হিসেবে যুক্ত ছিল রকেয়া হেলথ ক্লিনিক, ফোর্ট্রেস, রয়্যাল মেরিনা হোল্ডিংস পিএলসি, গ্রিনলিফ, এসএমটিসি এবং এটিএন নিউজ।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, মানুষের কর্মচঞ্চল জীবনে কাজের পাশাপাশি অবসর ও বিনোদনের জন্য ক্রীড়া, সংস্কৃতি এবং পর্যটন অপরিহার্য। কিন্তু পূর্ববর্তী ফ্যাসিবাদী সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে দখল করে বলপ্রয়ের মাধ্যমে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছিল। শিক্ষা, বিচারালয়, নির্বাচন কমিশন, ব্যাংক-বীমাসহ দেশের প্রতিটি রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে এক ভয়াবহ অচল অবস্থা এবং অন্ধকার যুগের সৃষ্টি করা হয়েছিল। মুষ্টিমেয় কিছু পরিবার জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে দেশে লুটেরা অর্থনীতি কায়েম করেছিল।” তিনি আরও যোগ করেন, “জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ন্যায়সঙ্গত অধিকারকে গুম, খুন ও আয়নাঘরের মাধ্যমে পদদলিত করার ফলেই ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল। এই আন্দোলনের তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও ব্যাপক।
বর্তমান সরকারের ৪ মাসের অর্জনের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আমরা একটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নীতি ও আদর্শকে ধারণ করে, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তরুণ নেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা এখানে ব্যর্থ হতে আসিনি, আমরা সফল হবই। দেশের সংস্কৃতি, শিক্ষা, আইন ও অর্থনৈতিক কাঠামোকে একটি শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সংস্কৃতি ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশের সাথে আমাদের কালচারাল ডিপ্লোমেসি বা সাংস্কৃতিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশের হৃত গৌরব ও হারানো ঐশ্বর্য পুনরুদ্ধার করতে চাই। একসময় সারা পৃথিবী থেকে মানুষ ভাগ্য অন্বেষণে এই বাংলায় আসত, বাংলার মানুষ কোথাও যেত না। ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে লিখেছিলেন যে, এ দেশে প্রবেশের হাজারটি দরজা আছে কিন্তু বেরোনোর পথ নেই। এই সমৃদ্ধ সভ্যতা ও ঐতিহ্যকে আমাদের পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এ লক্ষ্যেই সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ দ্বিগুণ করেছে, যেন আমাদের সন্তানেরা প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আন্তর্জাতিক মানের মানবসম্পদে রূপান্তরিত হতে পারে।
সামাজিক অবক্ষয় ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, সুপরিকল্পিত চক্রান্তের মাধ্যমে আমাদের যুবসমাজকে মাদকের মরণছোবলে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হয়েছে। লোকালয়ে আগুন লাগলে যেমন দেবালয় রক্ষা পায় না, তেমনি সমাজ ধ্বংস হলে আমাদের কারোর সন্তানই নিরাপদ থাকবে না। তাই সমাজ থেকে মাদক নির্মূলে অত্যন্ত কঠোর আইন প্রণয়ন ও তা প্রয়োগ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আমরা ঐতিহ্যবাহী ‘যাত্রা’ ও থিয়েটারকে পুনরায় চালু করব; তবে তা হবে জীবনমুখী, যা মানুষের সংগ্রামের কথা বলবে। কোনো ধরনের জীবনবিমুখ, শৃঙ্গার রসাত্মক বা অশ্লীল অপসংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। আমরা হাছন রাজা, লালন ফকির, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদী ও ভাটিয়ালির মতো আমাদের মৌলিক লোকসংস্কৃতিকে নতুন করে তরুণ প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে আনব।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের শেষে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে দেশের সব পুরাকীর্তি ও হেরিটেজ সংরক্ষণের ওপর জোর দেন এবং ময়মনসিংহের শালবন বিহার জাদুঘরে সংরক্ষিত সাড়ে তিন লক্ষ বছর পূর্বের কাঠের গুড়িসহ অন্যান্য প্রাচীন ঐতিহাসিক নিদর্শনের কথা উল্লেখ করে বাঙালি জাতির সুসভ্য ইতিহাসের গৌরব গাঁথা স্মরণ করেন। পরিশেষে, তিনি সমাজের বিভিন্ন স্তরের গুণীজন ও সফল উদ্যোক্তাদের হাতে ‘সুপার সাকসেস অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’ তুলে দেন এবং দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।