অনাবাদী পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্প
অনাবাদী পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্প
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত জুন ১৭, ২০২৬
রাজীব দে:
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অধীনে বাস্তবায়নাধীন ‘অনাবাদী পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন (২য় সংশোধিত)’ প্রকল্পের কার্যক্রম পর্যালোচনা ও অবহিতকরণের লক্ষ্যে একটি জাতীয় পর্যায়ের সমাপনী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ সকাল ০৯:০০ ঘটিকায় ঢাকার ফার্মগেটস্থ বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) অডিটোরিয়ামে এই কর্মশালাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব জনাব ড. রফিকুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জনাব মো: আব্দুর রহিম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব জনাব মির্জা আশফাকুর রহমান, সম্প্রসারণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব জনাব মো: সেলিম খান এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (BARC) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো: আবদুল্লহ সালাদ।
কর্মশালায় দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯২টি উপজেলার ডিএই-এর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, কৃষক প্রতিনিধি এবং পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডি-সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার কর্মকর্তাবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। কর্মশালায় বক্তারা জানান, দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং অনাবাদী জমির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলার ৪৯২টি উপজেলায় প্রকল্পটি অত্যন্ত সফলতার সাথে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্প এলাকার বসতবাড়ির আশেপাশে পড়ে থাকা অনাবাদী পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় এনে দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত মোট ৪,৯৯,৯০০টি পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া স্যাঁতসেঁতে জমিতে কচু জাতীয় সবজি চাষ প্রদর্শনী ৭,৩৮০টি, ছায়াযুক্ত স্থান বা বসতবাড়িতে বস্তায় আদা/হলুদ চাষ প্রদর্শনী ২০,১৮৮টি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যাকইয়ার্ড বা উপযুক্ত খালি জায়গায় পুষ্টিবাগান স্থাপন ৯৮৪টি, মরিচ চাষ প্রদর্শনী ৪৬,৭০৭টি এবং পারিবারিক পুষ্টি বাগান রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনঃস্থাপন প্রদর্শনী ৪৯,৮৪৮৫টি-সহ সবজি ও মসলা ফসলের মোট ৫৩,৭০২২টি প্রদর্শনী সফলভাবে স্থাপন করা হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতোমধ্যে ১৪২টি কমিউনিটি বেইজড ভার্মিকম্পোস্ট (কেঁচো সার) উৎপাদন পিট স্থাপন করা হয়েছে।
প্রকল্পের অর্জনসমূহ তুলে ধরে বক্তারা আরও জানান, এই প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৪,৯৫৯.০৬ হেক্টর অনাবাদী জমি চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন কার্যক্রম যেমন- প্রদর্শনী, প্রশিক্ষণ ও উঠান বৈঠক বাস্তবায়নের ফলে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে অতিরিক্ত আরও ১৮০০ হেক্টর অনাবাদী জমি আবাদের আওতায় এসেছে। প্রকল্পের সুবাদে মোট ৬,২১,৭৫২.৭৫ মে. টন শাকসবজি ও আদা-হলুদ উৎপাদিত হয়েছে, যার আনুমানিক আর্থিক মূল্য প্রায় ২,১৮১ কোটি ১৬ লাখ ৪০ হাজার ২৭০ টাকা। পাশাপাশি মোট ২১,৪২৬.৩৭২ মে. টন জৈবসার ও কেঁচোসার উৎপাদিত হয়েছে, যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি ৩১ লাখ ১০ হাজার ৬৪০ টাকা। উৎপাদিত মোট ফসল ও সারের মাধ্যমে চলতি বাজার মূল্যে প্রকল্পের মোট আর্থিক অর্জন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২,২১৪ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ৯১০ টাকা।
প্রধান অতিথি ড. রফিকুল ইসলাম তার বক্তব্যে বলেন, “যুগোপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কৃষির টেকসই উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। এই প্রকল্প থেকে অর্জিত শিক্ষা ও সফল মডেলসমূহ ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সম্প্রসারণ করা হবে, যা দেশের কৃষি উন্নয়ন, পুষ্টি নিরাপত্তা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করবে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রকল্প এলাকার মানুষ পুষ্টি বিষয়ে যে বাস্তব জ্ঞান লাভ করেছে, তা তারা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখবেন এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ বিষয়ে সার্বিক নজরদারি বজায় রাখবে।
কর্মশালায় নারীদের অংশগ্রহণকে এই প্রকল্পের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়। পারিবারিক পুষ্টি বাগান ও ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদনের মাধ্যমে গ্রামীণ নারীরা পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। বক্তারা এই সফলতার ধারাবাহিকতা রক্ষায় দেশের পুষ্টি ঘাটতি পূরণে এই প্রকল্পের আদলে ভবিষ্যৎ ‘ছায়া প্রকল্প’ বা পরবর্তী ফেইজ গ্রহণের প্রস্তাব করেন।