• ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৩শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২০শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
আগুনবেলা

সরকারি সম্পদের দুর্বল ব্যবস্থাপনায় ৬.৩৯ লাখ কোটি টাকার ঝুঁকি, সামাল দিতে নতুন পিপিই ও লিজ ম্যানুয়াল

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত জানুয়ারি ১৭, ২০২৬
সরকারি সম্পদের দুর্বল ব্যবস্থাপনায় ৬.৩৯ লাখ কোটি টাকার ঝুঁকি, সামাল দিতে নতুন পিপিই ও লিজ ম্যানুয়াল


সরকারি সম্পদের দুর্বল ব্যবস্থাপনায় ৬.৩৯ লাখ কোটি টাকার ঝুঁকি, সামাল দিতে নতুন পিপিই ও লিজ ম্যানুয়

সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অদক্ষ পরিচালনা থেকে সৃষ্ট আর্থিক ঝুঁকি এখন সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। দুর্বল তদারকি ও অকার্যকর লিজ ব্যবস্থাপনার কারণে সরকারের এই অনিশ্চিত দায় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে না আনলে ভবিষ্যতে তা হঠাৎ বড় সরকারি ব্যয়ে রূপ নিতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে এই বাস্তবতায় সরকারি সম্পদের সুশাসন জোরদার করা, দীর্ঘমেয়াদি দায় নিয়ন্ত্রণে আনা এবং ফিস্কাল ঝুঁকি দৃশ্যমান করার লক্ষ্যে নতুন ‘প্রপার্টি, প্ল্যান্ট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট (পিপিই) ও লিজ ম্যানুয়াল’ চালু করেছে সরকার। কক্সবাজারে ‘এসওই ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সুশাসন: অগ্রগতি পর্যালোচনা ও করণীয়’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
অর্থ বিভাগের স্ট্রেংদেনিং পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম টু এনাবল সার্ভিস ডেলিভারি (এসপিএফএমএস) কর্মসূচির এসওই গভর্ন্যান্স স্কিমের উদ্যোগে গত ১৬ ও ১৭ জানুয়ারি এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট ও সামষ্টিক অর্থনীতি) মো. হাসানুল মতিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত সচিব (বাজেট) ও এসপিএফএমএসের জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক ড. জিয়াউল আবেদীন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেলের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) রহিমা বেগম। এতে অর্থ বিভাগসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রায় ৮০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন।
অর্থ বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, দেশে সরকারের অনিশ্চিত দায় বা কনটিনজেন্ট লায়াবিলিটির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৭৮২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, যার বড় অংশই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান (এসওই), স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা এবং দুর্বলভাবে নিয়ন্ত্রিত সম্পদ ও লিজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত। এই দায় ভবিষ্যতে হঠাৎ সরাসরি সরকারি ব্যয়ে পরিণত হলে বাজেট ও সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে। এ প্রসঙ্গে কর্মশালায় বক্তারা বলেন, শক্তিশালী সুশাসন, সমন্বিত ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা এবং নীতিগত সংস্কার ছাড়া এই ৬.৩৯ লাখ কোটি টাকার ঝুঁকি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
উদ্বোধনী অধিবেশনে মো. হাসানুল মতিন বলেন, কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অদক্ষ পরিচালনার কারণে কনটিনজেন্ট লায়াবিলিটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই উদ্দেশ্যে একাধিক কর্তৃপক্ষ গড়ে ওঠায় কাজের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, যা পরিহার করা জরুরি। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ভালো শিখণ চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুশাসনের পথে ফিরতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাড়তে থাকা ঋণের চাপ এবং রাজস্ব আয়ের নিম্নগতি। এসব সমস্যা সমাধানে পুরো সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ড. জিয়াউল আবেদীন বলেন, ‘বাজার অর্থনীতিতে কেবল বাণিজ্যিকভাবে টেকসই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোই টিকে থাকার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি। এসব প্রতিষ্ঠান সংস্কারে শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য।’ তিনি বলেন, টেকসই ব্যবসায়িক মডেলের মাধ্যমে এসওইগুলোর ভবিষ্যৎ নতুন করে ভাবতে হবে।
রহিমা বেগম বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও অদক্ষতা, দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির অভাবের কারণে ঋণ ও অনিশ্চিত দায় বেড়েছে। তিনি বলেন, শক্তিশালী অডিট, ডিজিটাল সিস্টেম ও উন্নত তদারকির মাধ্যমে কার্যকর সমাধানের পথে এগোচ্ছে সরকার।
কর্মশালায় চারটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম সেশনটি ছিল ‘সাব্রে+ সিস্টেম: এসওই ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সমন্বিত ডেটাবেস’। এতে উপস্থাপনা করেন অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম। সেশনটি সঞ্চালনা করেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় বলা হয়, সাব্রে+ একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, যেখানে এসওই ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে। সরকারি গ্যারান্টি, লোকসান ও দুর্বল লিজ ব্যবস্থাপনা থেকে সৃষ্ট ঝুঁকিগুলো নিয়মিত বাজেট হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। যথাযথ নজরদারি না থাকলে এসব ঝুঁকি হঠাৎ সরাসরি সরকারি ব্যয়ে পরিণত হতে পারে।
দ্বিতীয় সেশনটি ছিল ‘ডিসিএল স্টেটমেন্টস ও এসওই এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ফিস্কাল রিস্ক স্টেটমেন্ট’। এতে উপস্থাপনা করেন অর্থ বিভাগের এসওই উইংয়ের পরিচালক মোঃ ইব্রাহিম খলিল। সেশনটি সঞ্চালনা করেন রহিমা বেগম। আলোচনায় জানানো হয়, সরকারি মূল্যায়ন অনুযায়ী ২৮টি উচ্চঝুঁকির সংস্থার অবশিষ্ট দায় জিডিপির ১.৬৭ শতাংশের সমান এবং ১৪টি অতিঝুঁকিপূর্ণ সংস্থার দায় জিডিপির ৩.১৩ শতাংশ । পাশাপাশি অডিট প্রতিবেদন বিলম্ব, দুর্বল অডিট কমিটি, পেশাদার হিসাবরক্ষকের ঘাটতি ও অসম্পূর্ণ আর্থিক তথ্যের মতো সমস্যাও চিহ্নিত করা হয়েছে।
তৃতীয় সেশনটি ছিল ‘পিপিই ও অন্যান্য সম্পদের নীতিমালা এবং স্থায়ী সম্পদ নিবন্ধন প্রস্তুতকরণ’। এতে উপস্থাপনা করেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. ফিরোজ আহমেদ। সেশনটি সঞ্চালনা করেন অর্থ বিভাগের ব্যয় ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ মনজুরুল হক। আলোচনায় জানানো হয়, নতুন পিপিই ও লিজ ম্যানুয়াল সরকারি সম্পদের শ্রেণিবিন্যাস, মূল্যায়ন, অবচয়, লিজ ও হস্তান্তর সংক্রান্ত স্পষ্ট ও মানসম্মত নির্দেশনা দেবে। এটি আন্তর্জাতিক হিসাব মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
চতুর্থ সেশনটি ছিল ‘এসওই ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সুশাসন সংস্কার কৌশল ২০২৫–৩০’। এতে উপস্থাপনা করেন রহিমা বেগম। সেশনটি সঞ্চালনা করেন অর্থ বিভাগের বাজেট মনিটরিং, মূল্যায়ন ও প্রতিবেদন শাখার যুগ্ম সচিব ড. এ কে এম আতীকুল হক। এই অধিবেশনে জানানো হয়, প্রস্তাবিত কৌশলটির মূল লক্ষ্য হলো পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট (পিএফএম) ব্যবস্থার প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা, সিস্টেম ও প্রক্রিয়াগুলো আধুনিকায়ন করা এবং পুরো সরকারি খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা জোরদার করা। নীতিগত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ এসওই আইন প্রণয়ন, বার্ষিক ফিস্কাল রিস্ক স্টেটমেন্ট প্রকাশ, পিপিই ম্যানুয়াল হালনাগাদ, করপোরেট গভর্ন্যান্স চর্চা শক্তিশালী করা এবং সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইকুইটি ফাইন্যান্সিং উৎসাহিত করা। এ ছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাধীন কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের পরিধি সম্প্রসারণ, মানসম্মত প্রতিবেদন পদ্ধতি চালু এবং অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

June 2026
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930