সাম্প্রতিক রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনগুলোতে একের পর এক অভাবনীয় জয়লাভ করে ভারতের রাজনীতিতে নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্য পুনর্বহাল করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্ব নিয়ে যে সংশয় তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল তা সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়েছে। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের এই নির্বাচনগুলোর মধ্য দিয়ে নরেন্দ্র মোদি ও তাঁর দল কেবল নিজেদের ঘাঁটিই শক্ত করেনি, বরং দক্ষিণ ভারতের অ-হিন্দি বলয় এবং বাম-তৃণমূলের দুর্গ হিসেবে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গেও ঐতিহাসিক জয় উদযাপিত করছে।
এই জয়ের ধারা বজায় থাকলে, ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জওহরলাল নেহরুর ১৭ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার রেকর্ড ভেঙে ভারতের ইতিহাসে দীর্ঘতম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়তে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি।
দক্ষিণ ভারতে বিজেপির ঐতিহাসিক উত্থান: ভাঙল দ্রাবিড়ীয় ও বাম দুর্গ
সবচেয়ে বড় চমক এসেছে দক্ষিণ ভারতের রাজ্য তামিলনাড়ু এবং কেরালা থেকে, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে বিজেপি কখনো ক্ষমতায় ছিল না।
তামিলনাড়ু: ১৯৬৭ সালের পর এই প্রথম রাজ্যের দুই প্রধান দ্রাবিড় দল—ডিএমকে (DMK) এবং এআইএডিএমকে (AIADMK)—ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। অভিনেতা জোসেপ বিজয়ের নতুন দল ‘তামিলাগা ভেট্রি কড়গম’ (টিভিকে) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। তবে ডিএমকের এই ঐতিহাসিক পরাজয় আদর্শগতভাবে বিজেপির জন্য এক বিরাট জয়। কেন্দ্র পুনর্নির্ধারণ বা ‘ডিলিমিটেশন’ প্রক্রিয়ার বিরোধিতায় ডিএমকে ছিল অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর। তাদের পরাজয়ের ফলে ভবিষ্যতে লোকসভায় দক্ষিণ ভারতের আসন সংখ্যা কমলে তা সরাসরি বিজেপির রাজনৈতিক এজেন্ডাকেই ত্বরান্বিত করবে।
কংগ্রেস-ডিএমকে ফাটল এবং ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বিপর্যয়: নির্বাচনের পর তামিলনাড়ুতে সরকার গঠনে কংগ্রেস নতুন দল টিভিকে-কে সমর্থন করায় ক্ষুব্ধ ডিএমকে কংগ্রেসের সাথে দূরত্ব বাড়িয়েছে। এমনকি লোকসভায় তাদের আসন আলাদা করারও দাবি জানিয়েছে। এর ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রস্তাবিত শক্তিশালী বিজেপি-বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোট বড়সড় ধাক্কা খেল।
বামপন্থীদের শেষ দুর্গ কেরালায় বিজেপি ৩টি আসন জিতে ইতিহাস গড়েছে এবং ৬টি আসনে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। প্রায় ৪৭ শতাংশ সংখ্যালঘু (মুসলিম ও খ্রিষ্টান) অধ্যুষিত এই রাজ্যে বিজেপির এই পারফরম্যান্স কেরালায় সদ্য ক্ষমতায় আসা কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ (UDF) এবং বিদায়ী এলডিএফ (LDF)-এর জন্য চরম উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেরালা এবং ত্রিপুরা-পশ্চিমবঙ্গের পরাজয়ের পর, ১৯৭৭ সালের পর এই প্রথম ভারতের কোনো রাজ্যেই আর কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় রইল না। ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে আদর্শভিত্তিক দল হিসেবে মাঠ এখন সম্পূর্ণ ডানপন্থী বিজেপির দখলে।
আসাম:ডিলিমিটেশন (আসন সীমানা পুনর্নির্ধারণ), তীব্র মেরুকরণ এবং নগদ অর্থ সহায়তার সামাজিক প্রকল্পের ওপর ভর করে আসামে পুনরায় ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে মুসলিম-নির্ধারক আসন ২৯ থেকে কমে ২২-এ নেমে এসেছে। এর ফলে সংখ্যালঘু ভোট একচেটিয়াভাবে কংগ্রেসের ঝুলিতে গেছে (কংগ্রেসের ১৯টি আসনের ১৮ জনই মুসলিম)। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে কংগ্রেস আসামে ‘সংখ্যালঘুকেন্দ্রিক দল’ হিসেবে চিহ্নিত হবে, যা উল্টোদিকে হিন্দু ভোটকে বিজেপির দিকে আরও মেরুকৃত করবে।
পশ্চিমবঙ্গ:জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজ্যে স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো হিন্দুত্ববাদী দল হিসেবে বিজেপি ক্ষমতা দখল করে এক নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করেছে।
২০২৭-২৮ নির্বাচনী মৌসুমের আগে চাঙ্গা বিজেপি
এই চার রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (পদুচেরি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ভারতে আগামী দুই বছরের এক বিশাল নির্বাচনী মৌসুমের সূচনা হলো। ২০২৭ ও ২০২৮ সালের মধ্যে ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশসহ মোট ১৬টি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সাম্প্রতিক এই জয়ের ফলে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকা বিজেপি এখন অনেক বেশি সুবিধাজনক ও শক্তিশালী অবস্থানে থেকে সেই নির্বাচনী লড়াইয়ে নামবে।