• ১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২রা রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

বিআইপি’র সংবাদ সম্মেলন”নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে পরিকল্পনাবিদদের প্রত্যাশা”

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত আগস্ট ১০, ২০২৪
বিআইপি’র সংবাদ সম্মেলন”নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে পরিকল্পনাবিদদের প্রত্যাশা”

সাম্য,মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার এই লক্ষ্যসমূহকে সামনে রেখে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম। তথাপি স্বাধীনতার অর্ধ শতক পরেও এই মহান লক্ষ্যসমূহ জাতির জন্য অর্জিত হয়নি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ছাত্র জনতার গণ আন্দোলনের মাধ্যমে জাতির সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। ইতিমধ্যে ৮ আগস্ট গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সাম্য ও ন্যায্যতাভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, শোষণহীন, জবাবদিহিতামূলক এবং জ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পিত ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এর কাছে বাংলাদেশে ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের প্রত্যাশা ও পরামর্শ নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ

সর্বাগ্রে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; এবং এজন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর মধ্যে অপরাধের সাথে যুক্ত ও দুর্নীতিবাজ সদস্যদেরকে বিচারের আওতায় এনে পুনর্গঠন করে পুলিশ বাহিনীসহ সকল বাহিনী ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনা।

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধানের ক্ষমতা কাঠামোর ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে এক ব্যক্তি কেন্দ্রিক ক্ষমতা হ্রাস করে বিচার বিভাগ, সংসদ ও নির্বাহী বিভাগসমূহের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশের বিগত ৫৩ বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হয় না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটি তাত্ত্বিকভাবে উপযুক্ত শোনালেও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বাস্তবতা নেই। ফলে সংবিধান সংশোধন করে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন পরিচালনা করবার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

দেশের সংবিধান স্বীকৃত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান যেমন: বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন প্রভৃতিকে সত্যিকার অর্থেই স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা এবং এজন্য প্রয়োজনীয় আইন ও কাঠামো সংস্কার করা দরকার।

দেশের দুর্নীতি, অনিয়ম প্রভৃতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে একদিকে যেমন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক; অপরদিকে দুদক, সরকারের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা পরিদপ্তর প্রভৃতি সংস্থাগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার করা প্রয়োজন, যেন সংস্থাসমূহ সরকার দলীয় আনুগত্যের উর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে।

সকল সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে অতিরিক্ত দলীয় আনুগত্যকারী, বৈষম্যকারী, ক্ষমতার অপব্যবহার করা, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনের বিচারের আওতায় আনা; পরবর্তীতে সকল স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় আইন ও কাঠামোগত সংস্কার করা।

বাংলাদেশের সকল এলাকার জন্য নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন; এই সকল পরিকল্পনা দলিলকে অনুসরণ করে সকল ধরনের উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা এবং এতদসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান সমূহের পুনর্গঠন করা দরকার। এছাড়াও দেশের অর্থনৈতিক এবং স্থানিক (নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ) উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণে ও বাস্তবায়নে জন্য উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি এবং পেশাজীবীদের যথাযথ সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা এবং এতদ্ সংক্রান্ত গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

সকল স্তরের নীতি, পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন কর্মসূচি হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। সকল পর্যায়ে অংশীজন, পেশাজীবী এবং জনসাধারণের সম্পৃক্ততা এবং অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা, জাতি নির্বিশেষে এবং সকল সামাজিক ও স্থানিক অবস্থানের মানুষের সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্মীয়সহ সকল অধিকার নিশ্চিত করা হবে।

অবকাঠামোসহ ভৌত ও স্থানিক (নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ পর্যায়ে) উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমানে চর্চিত বিশেষ (এডহক), প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন পদ্ধতি পরিহার করে স্থানিক (নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ) পরিকল্পনার উপর ভিত্তি করে প্রয়োজন ও ন্যায্যতা অনুযায়ী প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কাঠামো ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেন রাষ্ট্রের সম্পদের ন্যায্য ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা রোধে সকল সকল ধরনের নীতি নির্ধারণ এবং উন্নয়ন কর্মসূচিতে সকল স্তরের স্থানিক (নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ) পরিকল্পনায় সন্নিবেশন জরুরিভাবে বিবেচনা করতে হবে। স্থানিক (নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ) পরিকল্পনার দিক থেকে আমরা মনে করি দেশব্যাপী সুষম উন্নয়ন ও ন্যায্য নগরায়ণ আবশ্যক। তাই দেশের জন্য একটি যুগোপযোগী ‘নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ পরিকল্পনা আইন’ এবং ‘জাতীয় নগর উন্নয়ন নীতিমালা’ প্রণয়ন জরুরি।

ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন ধারণার বিকেন্দ্রীকরণ করে দেশের আঞ্চলিক পর্যায়ে উন্নয়ন নিশ্চিত করবার পরিকাঠামো ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা দরকার।বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্যকে আমলে নিয়ে সুষম উন্নয়ন দর্শনকে প্রাধান্য দিয়ে এডিপির বরাদ্দ দেয়া ও জেলাভিত্তিক বাজেট কাঠামো প্রণয়ন করা। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থাসমূহের ঢাকাকেন্দ্রিকতা পরিহার করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, বড় শহরমুখী অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন মোকাবেলা, পরিবেশ দূষণ কমানো এবং নদী-জলা দখল রোধ, পাহাড় কাটা বন্ধ করা এবং সর্বোপরি নগরের জীবন মান উন্নয়নে প্রত্যেকটি বিভাগীয় শহরে প্রয়োজনীয় নাগরিক পরিষেবা, চিকিৎসা, স্বাস্থ্য, গণপরিবহণ ব্যবস্থা, বিনোদন, সুবিধা থাকা অপরিহার্য।

১২। যে কোনো পর্যায়ের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং উন্নয়ন কর্মসূচিতে পরিবেশ, প্রতিবেশ, প্রাণ-প্রকৃতিকে কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে বাসযোগ্য বাংলাদেশে বিনির্মাণের দর্শন ঠিক করতে হবে। দেশের সকল দখলকৃত নদী, খাল, পার্ক, খেলার মাঠ অনতিবিলম্বে উদ্ধার করে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। সুতরাং, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক অবস্থান ও চ্যালেঞ্জসমূহ বিবেচনায় নিয়ে জাতীয়, আঞ্চলিক এবং স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষাপূর্বক টেকসই নগর ও বসতির বিকাশ, কৃষি জমি রক্ষা, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন প্রভৃতি কাজের জন্য সারাদেশের জন্য উপযুক্ত স্থানিক (নগর, অঞ্চল ও গ্রামীণ) পরিকল্পনা পরিকাঠামো গড়ে তোলা।

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং প্রয়োজনীয় বিকেন্দ্রীকরণ করা। সরকারের অনেক ধরনের কর্মযজ্ঞ যেমন স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ইত্যাদি পরিষেবাসমূহ কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে না রেখে স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করা যেতে পারে। বিশ্বের উন্নত দেশের পাশাপাশি অনেক উন্নয়নশীল দেশও (উদাহারণস্বরূপঃ ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি) স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সংস্কার সাধন করেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণাকর্ম পরিচালনার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে নাগরিক পরিষেবার একটা বড় অংশ স্থানীয় সরকারের হাতে ন্যস্ত করার মাধ্যমে স্থানীয় সরকার বিভাগকে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।

দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পাবলিক যানবাহন ব্যবস্থার বহুল প্রচলন করতে হবে। সরকারি সংস্থা থেকে শুরু করে নীতি নির্ধারকরাও যেন পাবলিক যানবাহন ব্যবহার করেন সেদিকে নজর দিতে হবে। দেশের পাবলিক যানবাহন, ফুটপাত এবং রাস্তাঘাট বয়স্ক, শিশু, শারীরিক অক্ষম, গর্ভবর্তী নারী এবং নারীবান্ধব করতে হবে।

একটা নগরকে কীভাবে গড়তে হয়, কীভাবে নিয়মের মধ্যে আনতে হয় সেটা শিক্ষার্থীরা যেভাবে জাতিকে শিখিয়েছে, সেভাবে জাতিকে আর কেউ শেখাতে পারেনি কখনো। ২০১৮ এর ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা দেখিয়েছে কীভাবে লাইসেন্স এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া, হেলমেট না পড়ে নিয়মকানুন না মেনে গাড়ি চালানো যাবেনা। আজকে যে-সকল শিক্ষার্থী ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে, শহরকে পরিষ্কার রাখছে তারা আমাদের সুস্পষ্টভাবে এই শিক্ষা দিচ্ছে, আমরা যেন ট্রাফিক আইন মেনে চলি, নিজ শহরে ময়লা না ফেলি, নাগরিক আইন মেনে চলি।

একইসাথে আমাদের ভবিষ্যৎ দেশ বিনির্মাণের কারিগর শিক্ষার্থীদের দেশ গড়বার কাজে সম্পৃক্ত করবার লক্ষ্যে প্রতিটি স্কুলের সকল শিক্ষার্থীকে তিন মাসে অন্তত একদিন স্কুলের আশেপাশে বিভিন্ন ধরনের স্বেচ্ছাসেবা কার্যক্রম (সচেতনতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রচারণা, বৃক্ষরোপণ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি) সাথে যুক্ত করা উচিত।

১৫। বিদ্যমান অর্থনৈতিক-সামাজিক পরিকল্পনাসমূহের সফল বাস্তবায়নের স্বার্থে স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকে অত্যাবশ্যক করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা। এ প্রেক্ষিতে নগর, পরিবহণ, পরিষেবা সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা সংস্থাগুলোকে আরো জনমুখী, আমলা নির্ভরতা হ্রাস করা এবং সর্বোচ্চ পেশাগত বিশেষজ্ঞ নির্ভর করা জরুরি।

একটি সাম্য ও ন্যায্যতাভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, শোষণহীন, জবাবদিহিতামূলক এবং জ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পিত নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের সকল অংশীজনের ন্যায় পরিকল্পনাবিদদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে অব্যাহত সহযোগিতা প্রদানে পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিআইপি সকল ধরনের সহযোগিতা প্রদান করবে।

September 2026
S S M T W T F
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930