গতকাল ৬ অক্টোবর দুপুর ৩.১৫ টায় আমার এক বন্ধু সহ বনানী স্টার কাবাব এ দুপুরের খাবার খেতে যাই। ওয়েটারকে মেন্যু জিজ্ঞেস করে খাসির কাচ্চি দিতে বলি। আমার বন্ধু আগেই খেয়ে আসায় আমি একাই খাওয়া শুরু করি। অতঃপর কাচ্চির ভিতরে থাকা টিক্কা খাওয়ার সময় তাতে দুর্গন্ধ পাই এবং ম্যানেজারের কাছে অভিযোগ দেই। ম্যানেজার টিক্কা চেক না করেই বলেন, টিক্কা এমনই হয়। আমি বলি, টিক্কা তো সামনেই আছে, আপনি গন্ধ দেখেন। সে না দেখে বলে, টেবিলে বসে খান। টিক্কা এমনই হয়, জীবনে খাননাই টিক্কা। এতে আমি উচ্চস্বরে এবিষয়ের প্রতিবাদ করলে আরও তিনজন বিভিন্ন টেবিল থেকে তাদের টিক্কাও গন্ধ বলে জানায়। এতে ম্যানেজার দুঃখ প্রকাশ না করলে আমি উত্তেজিত হই। সেসময় ম্যানেজার কলিংবেল বারবার চেপে হোটেলের ১২ থেকে ১৪ জন ওয়েটার ও কয়েকজন দালালকে মুহূর্তের মধ্যে ডেকে আনে। তারা জড়ো হয়ে আমাকে ঘিরে ফেলে। এসময় তারা চিৎকার করতে থাকে বনানী তাদের জায়গা। তাদের জায়গায় বসে খাবার যেমনই হোক, প্রতিবাদ করার সাহস আমি কীভাবে পাই বলতে বলতে আমাকে আক্রমণ শুরু করে। এতে দোতলা থেকে স্টাফ ও দালাল মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬ জন আমাকে নীচতলায় যেখানে সিসিটিভি নেই সেখানে নিয়ে যায়। আমি চলে যেতে চাইলে তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মাথায়, পেটে, বুকে, পিঠে, হাতে ও পায়ে উপর্যুপরি লাত্থি দেয় এবং গলা চেপে ধরে। তারা ১৪-১৫ জন এবং আমি একা হওয়ায় জোশের বশে তারা কি করছিলো তাও সম্ভবত তারা বুঝতে পারছিলো না। এই সম্পূর্ণ ঘটনা ৪০ থেকে ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যায়। আমার ডানহাতে প্রচন্ড আঘাত পাই, ডানকপাল চোখের উপরে কেটে রক্ত পড়ে ফ্লোর ভিজে যায়। রক্ত দেখে তাদের মধ্যে সম্ভবত কিছুটা সম্বিত ফিরে আসে যে তারা কি করছে। এর মধ্যে কয়েকজন গ্রাহক এসে আমাকে উদ্ধার করে এবং দালাল ও স্টাফরা দৌড়ে স্টার কাবাব ও রেস্টুরেন্টের বিভিন্ন তলায় পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আমি রক্তমাখা কপাল, চোখ, মুখ ও শরীর নিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে যাই। ডান হাত ও ডান পায়ে ছিলো অসহনীয় ব্যাথা। পুরো শরীরও নাড়াতে পারছিলাম না। এর মধ্যে ওদের কয়েকজন দালাল আবার এসে আমাকে পাশের কোন হাসপাতালে নিতে চায়, যাতে এই ঘটনা থানা পর্যন্ত না যায়। আমি উপস্থিত লোকজনকে থানায় ফোন দিতে বললে দালালরা বলতে থাকে, এটা তাদের বনানী, ওদের এলাকা। তাদের কেউ কিছু করতে পারবে না, তাদের সব কেনা, ওই এলাকার রাজনীতিবিদ, থানা কেনা। আমি যাতে হাসপাতালে চলে যাই এবং এটা নিয়ে কোথাও অভিযোগ না দেই। উপস্থিত জনগণ দালালদের কথার প্রতিবাদ করে এবং থানায় খবর দেয়। থানা থেকে এসআই একজন তার টিম সহ আসে যারা আমাকে হাসপাতালে যেতে বলে। তবে আমি আক্রমনকারীদের আটক করার পর হোটেল ত্যাগ করবো বলে জানালে তারা নিশ্চুপ হয়ে থাকে। এসময় আমি আমার গণমাধ্যম কর্মী বন্ধুদের জানালে তারা বনানী জোনের ডিসি, এসি ও ওসিকে ফোন দেন। কিছুক্ষণ পর ডিসি ও ওসির নির্দেশে অন্য একটি টিম এসে আমার প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে ম্যানেজার সহ ১০-১১ জনকে নজরদারিতে রাখে এবং আমাকে সরকারি কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তার স্লিপ ও অভিযোগ নিয়ে আসতে বলে। এর মধ্যে আমার ছয়জন গণমাধ্যম কর্মী বন্ধু আসে, যারা তাৎক্ষণিক উপস্থিত জনতার সাক্ষাৎকার নেয় এবং সঠিক ঘটনা তুলে ধরে সংবাদ প্রচার করে। আমাকে বনানী থানা পুলিশ তাদের গাড়িতে করে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যায়, চিকিৎসা করায়। এর মধ্যে আমার বন্ধুরা বনানী স্টার কাবাব এর সামনে জড়ো হয়। আমি সন্ধ্যা ৭ টায় আমার গণমাধ্যম কর্মী বন্ধুদের সাথে নিয়ে বনানী থানায় যাই এবং ম্যানেজার সহ স্টাফদের বিরুদ্ধে মামলা করি। এর মধ্যে থানায় বিভিন্ন জায়গা থেকে মামলা না নেওয়ার জন্য ফোন আসা শুরু হয়। আমার সামনে দুটি বড় ফোন আসে মামলা না নেওয়ার জন্য। তবে ওসি’র দৃঢ়তা ও আমার গণমাধ্যম কর্মী বন্ধুদের সহায়তায় মামলা করা হয় এবং স্টার কাবাব এর ম্যানেজার ও আক্রমণে জড়িত ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
পুরো সময় আমার সাংবাদিক বন্ধুরা আমার পাশে যেভাবে দাড়িয়েছেন তার জন্য আমি তাদের কাছে আন্তরিক কৃতজ্ঞ। পুরো সময় আমার শতাধিক সাংবাদিক বন্ধু স্টার কাবাবে আমার উপর আক্রমণের পর পাশে দাড়ানো, প্রশাসনে চাপ প্রয়োগ করে অভিযুক্তদের আটক করা, মামলা করায় সহযোগিতা এবং রাত পর্যন্ত থানায় আমার সাথে থেকে সাহস ও শক্তি দিয়েছেন তা ভাষায় প্রকাশ করার নয়। আমার কৃষিবিদ বন্ধুরাও আমাকে পুরো সময় সহযোগিতা করেছে। এজন্য আমি আমার কৃষিবিদ কমিউনিটির প্রতিও আন্তরিক কৃতজ্ঞ।
আমি এখন বাসায় আছি। কপালে ডানদিকে সেলাই করে ডাক্তার ব্যান্ডেজ করে দিয়েছে। সময় সল্পতায় হাতে এক্সরে করা হয়নি, তবে ডানহাতে প্রচন্ড ব্যাথা। সম্ভবত ডানহাতের জয়েন্ট কিছুটা ডিসপ্লেস হয়েছে। একটু পর এক্সরে করাবো। ব্যাথার ঔষধ সহ আরও কয়েকটি ঔষধ খাচ্ছি।
গতকাল রাত থেকে আটককৃতদের মুখের দিকে তাকিয়ে খারাপ লাগছে। ম্যানেজার থানায় পা ধরে মাফ চাইলো রাতে। আসলে মূহুর্তে ক্ষমতার দম্ভে মানুষ অমানুষ হয়ে যায়। যারা ছিলো গ্রাহক সেবা দেওয়ার জন্য, তারা মনে করেছিলো একসাথে ১৪-১৫ জন একজনকে মারলে কিছুই হবে না৷ আমি সাংবাদিক বন্ধুদের পাশে না পেলে হয়তো তাদের আটক করা হতো না, কিছুই হতো না। তারা ভাবতো এদেশে বিচার নেই, আইনের শাসন নেই। আমিওতো মানুষ, তারাওতো মানুষ। আমার পরিবার আছে, তাদেরও পরিবার আছে। তাদের ক্ষমা করে দেওয়া ঠিক হবে কিনা জানিনা। আসলে ক্ষমতা ও বিচারহীনতা মানুষকে পশুতে পরিণত করে। তাদের গ্রেফতার করায় সমাজের কাছে একটি বার্তা যাক, মানুষ যাতে আইনের ভয়েও মানুষ হয়ে ওঠে। আল্লাহ সবাইকে হেদায়েত দান করুন। আমিন।