• ৯ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৫শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৬শে সফর, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

শ্রদ্ধাঞ্জলি: বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত ডিসেম্বর ১০, ২০২৫
শ্রদ্ধাঞ্জলি: বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন

আজ ১০ই ডিসেম্বর, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিনের ৫৪ তম শাহাদাত বার্ষিকী। এই দিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে সেই অকুতোভয় বীর’কে যিনি জীবন উৎসর্গ করে রচনা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তার বীরত্ব, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেম চিরকাল আমাদের প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

মোহাম্মদ রুহুল আমিন ৫ জুন ১৯৩৫ সালে নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানাধীন বাগপাঁচড়া নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁদের পরিবারটি একটি সচ্ছল গৃহস্থ পরিবার ছিল। রুহুল আমিন ছিলেন পরিবারের প্রথম সন্তান। দীর্ঘদেহী ও সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়ার ফলে ৭ ভাইবোনের মধ্যে রুহুল আমিনকে সহজেই আলাদা করা যেত। নিজ গ্রাম বাগপাঁচড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই রুহুল আমিনের শিক্ষাজীবন শুরু হয়। বাল্যকাল থেকেই লেখাপড়া ও জ্ঞান অনুসন্ধানে তাঁর গভীর অনুরাগ পরিলক্ষিত হয়। নিজ গ্রাম থেকে প্রাথমিক লেখাপড়া শেষ করে তিনি পার্শ্ববর্তী থানার আমিষাপাড়ার গ্রামের হাই স্কুলে ভর্তি হন। পরে ১৯৪৯ সালে তিনি সোনাইমুড়ী উচ্চবিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রথমদিকে তাঁদের সংসারে অভাব-অনটন না থাকলেও ৭ ভাইবোনের পড়ালেখা ও ভরণপোষণের ব্যয় বহন করতে গিয়ে সংসারে অসচ্ছলতা দেখা দেয়। ফলে রুহুল আমিনের পক্ষে আর পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় তিনি জীবিকার সন্ধান করতে থাকেন।

অবশেষে, ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ সালে তিনি জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগদান করেন। নৌবাহিনীতে যোগদানের পর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য তাঁকে করাচির অদূরে আরব সাগরের মধ্যে অবস্থিত মনোরা দ্বীপে পিএনএস বাহাদুরে প্রেরণ করা হয়। সফলভাবে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষ করার পর কারিগরি প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য তাঁকে পিএনএস কারসাজে নৌবাহিনীর কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করা হয়। নৌবাহিনীতে তাঁর নম্বর দেওয়া হয় ৬২০৬৬। পরবর্তী সময়ে তিনি পাকিস্তান নৌবাহিনীর জাহাজ পিএনএস বাবর, পিএনএস খাইবার এবং পিএনএস এমতুল্লীলে দক্ষতা ও কৃতিত্বের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তিনি ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে শুভেচ্ছা সফরেও গমন করেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালি নিধন শুরু করলে দেশের মানুষ যখন স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন রুহুল আমিন তাঁর কর্মস্থল চট্টগ্রাম নৌঘাঁটি ত্যাগ করে গ্রামে ফিরে আসেন। তিনি গ্রামের ছাত্র-যুবক এবং সেনাবাহিনী থেকে আসা সৈনিকদের সংগঠিত করে সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। ১৯৭১ সালের মে মাসে প্রায় ৫শত ছাত্র ও যুবকসহ তিনি ৩ নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে গমন করেন এবং সেক্টর কমান্ডার মেজর কে এম সফিউল্লাহর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের সময় অনুদান হিসেবে প্রাপ্ত ২টি টাগ বোটকে কানাডীয় বাফোর গান এবং ব্রিটিশ ৫০০ পাউন্ড ওজনের মার্ক মাইন বহন করার উপযোগী করে গানবোটে রূপান্তরিত করা হয়। গানবোট ২টির নামকরণ করা হয় ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সেক্টর ও সাব-সেক্টর থেকে নৌবাহিনীর সদস্যদের সেপ্টেম্বর মাসে আগরতলায় একত্রিত করা হয়। ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন নৌবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আগরতলায় একত্রিত হয়ে কলকাতায় আসেন। তিনি ‘পলাশ’ গানবোটের আর্টিফিসার পদে যোগদান করেন।

ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার হয়েও রুহুল আমিন নিজ আগ্রহ ও প্রচেষ্টায় মাইন স্থাপনে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। ১১ নভেম্বর ১৯৭১ রাত সাড়ে ১২টা থেকে দেড়টার মধ্যে চালনা বন্দরের মোহনায় ৫ নং বয়া হতে ৮ নং বয়া পর্যন্ত মাত্র ১ ঘন্টায় ৪টি মাইন লাগিয়ে তিনি বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন। উল্লেখ্য, ১৩ নভেম্বর রাতে আর্টিফিসার রুহুল আমিনের লাগানো এসব মাইন বিস্ফোরিত হয়ে পাকিস্তান গানবোট ও জাহাজের বিশেষ ক্ষতিসাধন হয়।

৬ ডিসেম্বর যশোর সেনানিবাস মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসার পর মংলা বন্দরকে পাকিস্তানি সেনাদের দখলমুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তারই অংশ হিসেবে পদ্মা ও পলাশ এবং একটি মিত্র বাহিনীর গানবোট আইএনএস পানভেল হিরণ পয়েন্ট, মংলা বন্দর এবং খুলনার খালিশপুরে পাকিস্তানি নৌঘাঁটি পিএনএস তিতুমির দখলের উদ্দেশ্যে হলদিয়া ঘাঁটি থেকে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান স্টিমার পথ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ৯ ডিসেম্বর রাত ৮টার দিকে কোনো বাধা ছাড়াই গানবোটগুলো হিরণ পয়েন্টে প্রবেশ করে। হিরণ পয়েন্টে রাত্রিযাপনের পর ১০ ডিসেম্বর ভোর ৪টার দিকে গানবোট মংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে এবং পাকিস্তানি সৈনিকদের কোনোপ্রকার বাধা ছাড়াই সকাল সাড়ে ৭টায় মংলা বন্দরে পৌঁছে। সকাল সাড়ে ৯টায় শুরু হয় চূড়ান্ত অভিযান। গানবোট পানভেল আগে, পেছনে পলাশ ও পদ্মা। দুপুর প্রায় ১২টার সময় গানবোটগুলো যখন খুলনা শীপইয়ার্ডের নিকট তখন আকাশের অনেক উচুতে ৩টি জঙ্গিবিমান দেখা যায়। হঠাৎ বিমানগুলো নীচে নেমে আসে। পরে দক্ষিণ-পশ্চিমে উড়ে গিয়ে আবার ফিরে এসে পদ্মা ও পলাশের ওপর বোমা বর্ষণ শুরু করে। একটি বোমা পদ্মার ইঞ্জিনরুমে পড়লে ইঞ্জিনরুমটি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত হয়ে যায়। স্প্রিন্টারের আঘাতে বহু নাবিক হতাহত হয়। পুরোপুরি অচল হয়ে যায় পদ্মা। তখনও সচল থাকে পলাশ ও পানভেল। পাকিস্তানি জঙ্গিবিমানের বোমা থেকে পলাশ ও পানভেল রক্ষা পেলেও নাবিকদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়। ফলে সকলে বিক্ষিপ্তভাবে ছোটাছুটি শুরু করে। এসময় পলাশের অধিনায়ক সকলকে জাহাজ ত্যাগ করার আদেশ দেন। রুহুল আমিন যুদ্ধ না করে ভীরুর মতো জাহাজ ছাড়তে অস্বীকার করেন এবং নিজে দায়িত্ব পালন করার জন্য চলে যান ইঞ্জিনরুমে। তাঁর লক্ষ্য ছিল, যে করেই হোক পাকিস্তানিদের বিমান হামলা থেকে আমাদের গানবোটগুলোকে বাঁচাতে হবে। বিমানগুলো তাদের আক্রমণের গতিপথ পরিবর্তন করে পেছন থেকে উড়ে এসে কোনোরকম বাধা ছাড়াই বোমা বর্ষণ করতে থাকে। এমনই একটি বোমা পলাশের ওপর পড়ে পলাশের ইঞ্জিনরুমে আগুন ধরে যায়। এসময় পলাশের ইঞ্জিনরুমে যুদ্ধরত রুহুল আমিন এবং তাঁর সঙ্গী মহিবুল্লাহ প্রজ্বলিত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আগুনের লেলিহান শিখায় জাহাজে রাখা গোলাবারুদ বিস্ফোরিত হতে শুরু করে। এই অবস্থায় আর্টিফিসার রুহুল আমিন নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতরে তীরে উঠার সাথে সাথেই পশ্চাৎদিক হতে রাজাকাররা তাঁকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত গুলি বর্ষণ করতে থাকে। রাজাকারদের গুলিতে তিনি মারাত্মক আহত হন এবং তাদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শাহাদতবরণ করেন। পরে গ্রামবাসীরা এই অসীম সাহসী বীর যোদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করে যথাযথ মর্যাদার সাথে ভৈরব নদীর তীরে দাফন করে। কালক্রমে শহীদ রুহুল আমিনের সমাধি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের অসীম সাহসিকতা, দক্ষতা, রণ কৌশল এবং সর্বোপরি দেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক খেতাব বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর বীরত্ব ও আদর্শ আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে সংযোজিত হয়ে থাকবে। এই বীরশ্রেষ্ঠের বীরত্বগাথা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দেশমাতৃকার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যুগ যুগ ধরে অনুপ্রাণিত করবে।

August 2026
S S M T W T F
1234567
891011121314
15161718192021
22232425262728
293031