• ৩০শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৫ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৬ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেল সুইস প্রতিষ্ঠান মেডলগ, চুক্তি স্বাক্ষর

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ১৭, ২০২৫
পানগাঁও টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেল সুইস প্রতিষ্ঠান মেডলগ, চুক্তি স্বাক্ষর

ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বৈশ্বিক লজিস্টিক প্রতিষ্ঠান মেডলগ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ২২ বছর মেয়াদি পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল (পিআইসিটি) পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা করবে।

রাজধানী ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে সোমবার বিকালে (১৭ নভেম্বর) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ) এবং মেডলগ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের মধ্যে কনসেশন চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়।
সিপিএ চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস.এম. মনিরুজ্জামান এবং মেডলগ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ.টি.এম. আনিসুল মিল্লাত তাদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সরকার ও মেডলগের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন চুক্তি স্বাক্ষরের দিনটিকে “বাংলাদেশের জন্য একটি লাল অক্ষরের দিন” বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, পিআইসিটি একটি সুন্দর, কৌশলগত অবস্থানের অবকাঠামো হিসেবে নির্মিত হয়েছিল, তবে এটি শুরু থেকেই প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়েছিল এবং প্রতি বছরই লোকসান গুনছিল।
তার মতে, আমদানিকারকরা টার্মিনালটি ব্যবহার করতে চাননি কারণ লজিস্টিক্স কঠিন ছিল, পণ্যবহন সুবিধা অস্পষ্ট ছিল, শুল্ক ছাড়পত্র ধীর ছিল এবং এফওবি ডকুমেন্টেশনে পানগাঁওয়ের কথা খুব কমই উল্লেখ করা হতো।
উপদেষ্টা বলেন, টার্মিনালের নির্মাণ ব্যয় ছিল প্রায় ১৫৫ কোটি টাকা এবং গত ১২ বছরের পরিচালনা ব্যয় ১৬৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তিনি আরও বলেন, “মেডলগের সাথে অংশীদারিত্ব সেই বাস্তবতা বদলে দিয়েছে। মেডলগ এই টার্মিনালে একটি নতুন সূচনা আনছে।”
সুইস রাষ্ট্রদূত রেটো রেংগলি বলেন যে, এ চুক্তি স্বাক্ষর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। “এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতি একজন নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীর আস্থার প্রতিফলন। এটি সময়োপযোগী কারণ বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং সক্রিয়ভাবে আরও বেশি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার চেষ্টা করছে এবং ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতামূলকতা বৃদ্ধির জন্য বন্দর ও সরবরাহ খাতকে শক্তিশালী করছে।”

অনুষ্ঠানে মেডলগ বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ.টি.এম. আনিসুল মিল্লাত বলেন, “পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনালটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধি এবং লজিস্টিক্স দক্ষতার ক্ষেত্রে নতুন মান গড়ে তোলার অপরিসীম সম্ভাবনা রাখে। মেডলগের বিশ্বব্যাপী দক্ষতা কাজে লাগিয়ে এবং আমাদের কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে, আমরা টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারবো এবং অভ্যন্তরীণ লজিস্টিকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এ অঞ্চলের শীর্ষস্থানে নিয়ে যেতে পারবো।”
তিনি আরও বলেন, মেডলগের পরিচালনাগত উৎকর্ষতা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে কাজে লাগিয়ে প্রকল্পটি বাণিজ্যকে উজ্জীবিত করবে, সরবরাহ শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করবে এবং বাংলাদেশি লজিস্টিক্স খাতকে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে উন্নীত করবে।
অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন সচিব ড. নুরুন নাহার চৌধুরী এবং সিপিএ চেয়ারম্যান এস.এম. মনিরুজ্জামানও বক্তব্য রাখেন।
ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে ঢাকার কাছে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত চুক্তিটি মেডলগ এবং বাংলাদেশের লজিস্টিক ও বাণিজ্য অবকাঠামো উভয়ের জন্য এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে।
এই টার্মিনাল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দক্ষ পণ্য পরিবহনের উপর বিশেষভাবে জোর দেবে এবং মেডলগকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবহন নেটওয়ার্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।

নতুন চুক্তির আওতায়, মেডলগ এসএ তার স্থানীয় প্রতিষ্ঠান মেডলগ বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেডের মাধ্যমে পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনালের কার্যক্রম, সরবরাহ ও অটোমেশন তত্ত্বাবধান করবে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ লজিস্টিক্সকে সর্বোত্তম করার জন্য এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য বৈশ্বিক দক্ষতা ও উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে আসবে এখানে।
এই অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যে সহায়তা দেওয়ার জন্য মেডলগ টার্মিনালের সুবিধাগুলো বাড়াবে এবং এখানকার বার্ষিক হ্যান্ডলিং ক্ষমতা ১ লাখ ৬০ হাজার টিইইউয়ে উন্নীত করবে।
মাল্টিমোডাল সংযোগ জোরদার করার লক্ষ্যে পানগাঁওকে অন্যান্য নৌবন্দর ও সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে সংযুক্ত করতে মেডলগ অভ্যন্তরীণ বার্জ ভাড়া করবে। বার্জগুলো বৃহৎ আকারের পণ্যও পরিবহন করবে এবং অন্যদিকে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও রিফার যানবাহন অঞ্চলজুড়ে অতিরিক্ত সরবরাহ চ্যানেল খুলবে। উন্নত আন্তঃমোডাল পরিবহন অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের সঙ্গে সম্পর্কিত অনিশ্চয়তা কমাবে এবং লিড টাইম নিশ্চিত করবে, যা স্থানীয় আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য বড় সহায়ক হবে।

বাণিজ্য সুবিধা প্রদানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে, পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনাল একটি “থ্রু বিল অব লেডিং” সুবিধা প্রদান করবে, যার মাধ্যমে একক নথির অধীনে আন্তর্জাতিক বন্দর থেকে পানগাঁওয়ে পণ্য পরিবহন করা যাবে, যা সরবরাহ ও শুল্ক প্রক্রিয়াকরণকে সহজতর করবে। শুল্ক ছাড়পত্র আরও গতিশীল করার মাধ্যমে সরবরাহ দ্রুততর করতে যে গ্রিন চ্যানেল উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে টার্মিনালটি তার জন্যও সহায়ক হবে।

পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কন্টেইনার টার্মিনালের সরঞ্জাম ও সুবিধার মধ্যে থাকবে দুটি মোবাইল হারবার ক্রেন, রিফার কানেকশন এবং ২৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি একটি খালি কন্টেইনার স্টোরেজ, মেরামত ইয়ার্ড এবং স্টাফিং ও স্ট্রিপিংয়ের জন্য ১০ হাজার বর্গমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত কন্টেইনার ফ্রেইট স্টেশন। টার্মিনাল-সংলগ্ন জমিতে তুলা গুদামজাতকরণ এবং ড্রাই স্টোরেজ ডিস্ট্রিবিউশনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে, যা আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ সুবিধাজনক হবে।