সোমবার (১৯ অক্টোবর ২০২৬) বিজিএমইএ কমপ্লেক্সের নূরুল কাদের অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এর উদ্যোগে তৈরি পোশাক খাতের জন্য ‘ESG Platform’ (ESG Dashboard) এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাক শিল্পে Environmental, Social and Governance (ESG) কমপ্লায়েন্স এবং নতুন বৈশ্বিক চাহিদা পূরণে এই প্ল্যাটফর্মটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এর সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকাস্থ ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার, পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিআইজিডি এর রিসার্চ পরিচালক প্রফেসর মুন্সি সোলায়মান এবং ম্যাপড ইন বাংলাদেশ (MIB) এর টেকনিক্যাল লিড প্রফেসর মতিন আব্দুল্লাহ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বিজিএমইএ-এর পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মুস্তাফিজ।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে বিজিএমইএ এর সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান, সহ-সভাপতি (অর্থ) মিজানুর রহমান এবং পরিচালক নাফিস উদ দৌলা সহ বিজিএমইএর অন্যান্য নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ সদস্যগন উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান যে, বিগত আট মাসে সরকার জ্বালানি খাতে ৪.১২ বিলিয়ন ডলার ভর্তুকি প্রদান করেছে। বিগত সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ভঙ্গুর অর্থনীতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং শিক্ষিত যুবসমাজের কর্মসংস্থানের অভাব, -এই তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করে যাচ্ছে। উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর না বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বৃদ্ধি এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে একটি সক্ষম ও সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে সরকার কাজ করছে বলে তিনি জানান।
উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, ২০২৯ সালে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে এবং ফ্যামিলি কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ নিজস্ব রূপকল্প ও সংস্কার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে যা উন্নয়ন সহযোগীরাও প্রত্যক্ষ করছে। তিনি এ সময় তিনি বিজিএমইএ এর নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, বর্তমান সরকারের রূপকল্প বাস্তবায়নে বিজিএমইএ, বিকেএমইএ এবং বিটিএমএ অসাধারণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
সভাপতির বক্তব্যে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত চাহিদা এবং টেকসই পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের কারখানাগুলোকে আরও বেশি কমপ্লায়েন্ট ও তথ্যসমৃদ্ধ হতে হবে। বিজিএমইএ এর উদ্যোগে চালু হওয়া এই ‘ESG Platform’ আমাদের সদস্য কারখানাগুলোর পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসন সংক্রান্ত কার্যকারিতা মূল্যায়ন ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এ পর্যন্ত ৩২৬টি কারখানা এই প্ল্যাটফর্মে রিপোর্ট করেছে, তবে এই সংখ্যাটি এখনও যথেষ্ট নয়। শিল্পখাতের সার্বিক সুরক্ষায় এটি অচিরেই সদস্যদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে এবং প্রয়োজনে এ ব্যাপারে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ যৌথভাবে কাজ করবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বিজিএমইএ এর ESG Platform এর মূল উদ্যোগ গ্রহনকারী ও পরিচালক শেখ হোসেন মোহাম্মদ মুস্তাফিজ ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রার কথা তুলে ধরে বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পকে কেবল ‘কমপ্লায়েন্স’ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এটিকে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতায় রূপান্তর করতে হবে। ৩২৬টি কারখানার ডেটা নিয়ে তৈরি এই প্ল্যাটফর্মটি শিল্পখাতের স্বচ্ছতা ও টেকসই অর্জনে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার সরকারের অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান এবং একটি ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি অর্জনের জন্য জাতীয় ঐক্য, পুনর্গঠন ও উত্তরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি কার্যকর সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে জুলাই চার্টার বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির কেন্দ্র রয়েছে পোশাক শিল্প। টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে গতানুগতিক কমপ্লায়েন্স থেকে বেরিয়ে সাসটেইনেবিলিটিতে রূপান্তর এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য একটি শক্তিশালী রপ্তানি ভিত্তি অপরিহার্য এবং ‘ESG Data to Action’ দীর্ঘমেয়াদী সফলতা অর্জনে সহায়তা করবে।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির বিআইজিডি এর রিসার্চ পরিচালক প্রফেসর মুন্সি সোলায়মান তার বক্তব্যে বিজিএমইএ এর সদস্যভূক্ত সকল কারখানাকে এই ESG প্ল্যাটফর্মের আওতায় নিয়ে আসার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শেখ সুচিতা জাহান স্নেহা, প্রধান সমন্বয়কারী, রেসপনসিবল বিজনেস হাব ও বিজিএমইএ সেন্টার অব এক্সিলেন্স।
উল্লেখ্য, এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশে ডেনমার্ক দূতাবাস আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে এবং কারিগরি সহযোগিতায় রয়েছে BRAC Institute of Governance and Development (BIGD) ও Mapped in Bangladesh (MIB)। অনুষ্ঠান শেষে আমন্ত্রিত অতিথিরা নেটওয়ার্কিং সেশনে অংশ নেন।