রাজীব দে:
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় যাদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তাঁদের মধ্যে দীপাল সি. বড়ুয়া অন্যতম। দীর্ঘ কয়েক দশকের কর্মজীবনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তিনি দেশ-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছেন।
দীপাল সি. বড়ুয়া ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশন (BGEF)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি ওয়ার্ল্ড ফিউচার কাউন্সিল (WFC), হামবুর্গ, জার্মানির কাউন্সিলর এবং গ্লোবাল ১০০% রিনিউয়েবল এনার্জির অ্যাম্বাসেডর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে তাঁর অন্যতম বড় অবদান গ্রামীণ শক্তির প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করা। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হয়। এর ফলে বিদ্যুৎবিহীন ও বিদ্যুৎ-সুবিধাবঞ্চিত বহু পরিবার সৌরবিদ্যুতের সুবিধা পায়। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
দীপাল সি. বড়ুয়া বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য শক্তি সমিতি (BSREA)-এর সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (SREDA)-এর সাবেক সম্মানসূচক বোর্ড সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দেশের ক্ষুদ্রঋণ ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর কাজের অন্যতম বড় স্বীকৃতি ২০০৯ সালের জায়েদ ফিউচার এনার্জি প্রাইজ (বর্তমানে জায়েদ সাসটেইনেবিলিটি প্রাইজ)। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নে অবদানের জন্য তিনি এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করেন। এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সম্ভাবনাকেও বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে ভূমিকা রাখে।
২ সেপ্টেম্বর (বুধবার) একান্ত সাক্ষাৎকারে দীপাল সি. বড়ুয়া বলেন, “আমার বিশ্বাস ছিল, বিদ্যুৎ শুধু একটি প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়—এটি মানুষের জীবন বদলে দেওয়ার শক্তি। বাংলাদেশের গ্রামীণ মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় আনতে কাজ করতে গিয়েই নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা উপলব্ধি করি। সেই উপলব্ধিই আমাকে এই দীর্ঘ যাত্রায় অনুপ্রাণিত করেছে।”
গ্রামীণ শক্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, “লক্ষ্য ছিল এমন একটি মডেল তৈরি করা, যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও সহজে সৌরবিদ্যুতের সুবিধা পাবে। আমরা শুধু বিদ্যুৎ দিইনি; মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশ রক্ষার দিকেও গুরুত্ব দিয়েছি।”
জায়েদ সাসটেইনেবিলিটি প্রাইজের স্বীকৃতি
আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জনের অনুভূতি সম্পর্কে দীপাল সি. বড়ুয়া বলেন, “এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত সম্মান নয়; বাংলাদেশের জন্যও একটি গর্বের বিষয়। এই পুরস্কার আমাদের কাজকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করেছে এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আরও বড় পরিসরে কাজ করার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।”
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেন, “আমি আশাবাদী। সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ (Agrivoltaics), বায়ু ও বায়োগ্যাস—এসব খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক নীতি, গবেষণা এবং বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ সবুজ জ্বালানির ক্ষেত্রে একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।”
তরুণদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, “শুধু চাকরির চিন্তা নয়, উদ্ভাবনের চিন্তা করুন। প্রযুক্তি, গবেষণা ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে নিজেদের দক্ষ করে তুলুন। পৃথিবীর ভবিষ্যৎ আজকের তরুণদের হাতেই।”
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ সম্পর্কে তিনি বলেন, “জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি অপরিহার্য।”
ব্রাইট গ্রিন এনার্জি ফাউন্ডেশনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমরা গবেষণা, প্রশিক্ষণ এবং সবুজ প্রযুক্তির বিস্তারে আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই। বিশেষ করে কৃষি, শিক্ষা ও স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি।”
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে দীপাল সি. বড়ুয়া বলেন, “বিশ্বের অনেক দেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশও যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে গুরুত্ব দেয়, তাহলে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করা সম্ভব।”
জীবনের মূল দর্শন সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষ ও প্রকৃতি—উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করে। টেকসই উন্নয়নই আগামী বিশ্বের একমাত্র কার্যকর পথ।”
নিজের ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা তুলে ধরে দীপাল সি. বড়ুয়া বলেন, “আমি এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই, যেখানে প্রতিটি পরিবার নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সুবিধা পাবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলাই আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।”
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন ও টেকসই উন্নয়নে তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতি গড়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর উদ্যোগ ও দর্শন তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক এবং নীতিনির্ধারকদের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে।