সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও নাগরিকমুখী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনীতি, জলবায়ু চাপ ও বাড়তি ব্যয়ের বাস্তবতায় মোকাবিলায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে বুধবার দেশের তৃতীয় পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট (পিএফএম) সংস্কার কৌশল ২০২৫–২০৩০ আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করেছে অর্থ বিভাগ।
অর্থ মন্ত্রনালয়ের মালটিপারপাস হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এই কৌশলপত্রের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান, মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন এই কৌশলের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিগত পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। কেবল সিস্টেম ও প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কারের বাইরে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদার, স্পষ্ট ফলাফল অর্জন, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিকদের জন্য উন্নত সেবা প্রদানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পিএফএম সংস্কার কৌশল ২০২৫–২০৩০ উদ্বোধনকালে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহির জন্য দায়বদ্ধ। এজন্য নতুন করে দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশিত পিএফএম কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং জনসেবার মান উন্নত করা।’
তিনি কৌশল বাস্তবায়নে গতি আনতে অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দপ্তর (ওসিএজি)সহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, শক্তিশালী সুশাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং নাগরিকদের জন্য বাস্তব সুফল নিশ্চিত করতে হলে স্বচ্ছ সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য।
স্ট্রেনদেনিং পাবলিক ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম টু এনেবল সার্ভিস ডেলিভারি (এসপিএফএমএস) কর্মসূচির অর্থ বিভাগের মাল্টিপারপাস হলে এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থসচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নুরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেমস। স্বাগত বক্তব্য দেন এসপিএফএমএসের জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউল আবেদিন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বিশ্বব্যাংকের লিড গভর্ন্যান্স স্পেশালিস্ট সুরাইয়া জান্নাত।
অনুষ্ঠানে অর্থসচিব ড. খায়রুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘পিএফএম সংস্কার কৌশল বহু অংশীজনের ধারাবাহিক ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই দূরদর্শী ও সমন্বিত কৌশল প্রণয়নে অর্থ বিভাগ, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিরলস অবদানের জন্য আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।’
মো. নুরুল ইসলাম বলেন, পিএফএম সংস্কার যাত্রার মূল লক্ষ্য হলো রাজস্ব শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, আর্থিক প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন এবং আর্থিক সুশাসন জোরদার করা, যাতে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও নাগরিককেন্দ্রিক সরকারি আর্থিক সেবা নিশ্চিত করা যায়। তিনি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শক্তিশালী ও স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থার সহায়তায় একটি কার্যকর পিএফএম ব্যবস্থা ছাড়া এই সংস্কার এজেন্ডার সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’
বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যঁ পেমস বলেন, আইবাস++ বাস্তবায়ন এবং পেনশন ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশনের মতো সংস্কারের মাধ্যমে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যা সরকারি সম্পদের ব্যবহারে বিশ্বাসযোগ্যতা, তদারকি ও স্বচ্ছতা বাড়িয়েছে।
তবে এসব অর্জনের পরও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সরকারি ঋণসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে। এসব সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মানোন্নয়ন, সুশাসন জোরদার এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়ন, কার্যকর তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বছরব্যাপী ব্যাপক পরামর্শ এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় অর্থ বিভাগ তৃতীয় জাতীয় পিএফএম কৌশল প্রণয়ন করেছে। আগের সংস্কার গুলোতে চালু হওয়া আইবাস++, মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামো, ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্ট ও ই–জিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এই নতুন কৌশল তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাজেট বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের তদারকি, আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং নিরীক্ষা সুপারিশ বাস্তবায়নে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলোও এতে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৫–২০৩০ মেয়াদের কৌশল প্রণয়নে ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আর্থিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব আহরণ, সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা, ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা, ক্রয়প্রক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ ও বহিঃতদারকি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং সক্ষমতা উন্নয়ন। এই প্রথমবারের মতো কৌশলটিতে জলবায়ু সংবেদনশীল পিএফএম, জেন্ডার রেসপনসিভ বাজেটিং এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে পূর্ণাঙ্গভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কৌশলটির একটি কেন্দ্রীয় দিক হলো সহনশীলতা (রেজিলিয়েন্স)। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত তুলনামূলকভাবে কম এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দায় ও সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে বাড়তে থাকা আর্থিক চাপের প্রেক্ষাপটে উন্নত ম্যাক্রোফিসকাল পূর্বাভাস, সমন্বিত ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক ঝুঁকির স্বচ্ছ প্রতিবেদন ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত দুই দশকের সংস্কার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও বাজেট বাস্তবায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতে কাঙ্ক্ষিত ফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনীতি, জলবায়ুজনিত চাপ এবং বাড়তি ব্যয়ের বাস্তবতায় তাই একটি সমন্বিত ও ফলাফলভিত্তিক পিএফএম কৌশলের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। নতুন কৌশলটির লক্ষ্য হলো সংস্কারগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ এবং নাগরিকমুখী করা।