বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাত, বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত, যা ছিল সম্প্রতি এক। উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়িক সভার মূখ্য আলোচ্য বিষয়। নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকন আরাল্ড গুলব্র্যান্ডসেনের বাসভবনে। সম্প্রতি, “নেভিগেটিং দি ফিউচার: দি ইভলভিং ল্যান্ডস্কেপ অব লজিস্টিকস ইন বাংলাদেশ” শীর্ষক একটি আলোচনার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে রয়্যাল নরওয়েজিয়ান এম্ব্যাসি ঢাকা, দি হংকং অ্যান্ড সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন লিমিটেড (এইচএসবিসি) বাংলাদেশ এবং নর্ডিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এনসিসিআই)। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, গ্লোবাল অপারেটর এবং অর্থনীতিবিদদের অংশগ্রহণে এ আয়োজনে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। কীভাবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা। কাটিয়ে উঠতে পারে, লজিস্টিকস ব্যয় হ্রাস করতে পারে এবং অর্থনৈতিক রূপান্তরের যুগে প্রবেশের সঙ্গে। কীভাবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারে- এই বিষয়গুলো আলোচনায়। । গুরুত্ব পায়।
সেশনের শুরুতে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত নরওয়ের রাষ্ট্রদূত হাকোন অ্যারাল্ড গুলব্রান্ডসেন। এরপর। বক্তব্য রাখেন নর্ডিক চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এনিসিসিআই) সভাপতি ও গ্রামীনফোনের সিসিএও। তানভীর মোহাম্মদ এবং এইচএসবিসি সিইও মো. মাহবুব উর রহমান। মূল সেশন উপস্থাপন করেন এবং। অর্থনীতিবিদ ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল সালেহ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, মার্ক বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিখিল ডি লিমা।
মূল বক্তব্য উপস্থাপনের সময় এম মাসরুর রিয়াজ তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলাদেশের লজিস্টিকস। খাতের ভবিষ্যৎ চিত্র তুলে ধরেন। দ্রুত সংস্কার উদ্যোগ না নেয়া হলে আগামী দশকে পর্যায়ক্রমে প্রেফারেন্সিয়াল। ট্রেড এগ্রিমেন্ট (পিটিএ) বা বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা প্রত্যাহার শুরু হলে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান হারাতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
বর্তমানে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের নব্বই শতাংশেরও বেশি পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে, ফলে সেখানে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর এবং মংলা বন্দর সম্প্রসারণের মত মেগা প্রজেক্টগুলো চলমান থাকলেও শিল্প প্রধানরা কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, অবকাঠামো, নীতিগত সহায়তা ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উন্নয়নের উপর গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশের লজিস্টিকস খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও, কিছু সূক্ষ পরিবর্তনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা সম্ভব।
আলোচনায় এম মাসরুর রিয়াজ উল্লেখ করেন, পরিবহন খরচ কেবল ১% হ্রাস করা গেলেও তৈরি পোশাক। রপ্তানি প্রায় ৭.৪% বৃদ্ধি পেতে পারে। অন্যদিকে যদি বাংলাদেশের লজিস্টিকস খরচ অবকাঠামো ও নীতিগত। কিছু উন্নয়নের মাধ্যমে মাত্র ২৫% হ্রাস করা যায়, তাহলে দেশের রপ্তানি প্রায় ২০% বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, “জাতীয় মহাসড়কে নূন্যতম গতিবেগ কেবল ৪০ কি.মি/ঘণ্টা নিশ্চিত করলে রপ্তানি প্রায়। ৩.৭% বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া ডুয়েল টাইম (বন্দরে পণ্য অবস্থানের সময়) মাত্র একদিন হ্রাস করা হলে,। জাতীয় রপ্তানি ৭% এর বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।
। এই সেশনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের লজিস্টিকস চ্যানেল মোকাবেলা করতে সম্পূর্ণ ইকোসিস্টেম ভিত্তিক । একটি পদ্ধতি প্রয়োজন, যার মধ্যে থাকবে নিয়ন্ত্রক সংস্কার, বেসরকারি বিনিয়োগ, সরকারী-বেসরকারী ডায়ালগ । এবং প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা।
আলোচনায় জরুরী পদক্ষেপসমূহ::
দ্রুত কাস্টমস এবং ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন।
বে টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর সময়মত বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরনা।।
মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট ও আঞ্চলিক সংযোগে গুরুত্ব প্রদান।
লজিস্টিকস অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে কৌশলগত বিনিয়োগে আগ্রহ বৃদ্ধি।
ভবিষ্যতের বাণিজ্যে সাসটেইনেবিলিটি ও ডিকার্বোনাইজেশন সংযোজন।
হাকোন অ্যারাল্ড গুলব্রান্ডসেন বলেন, “যেহেতু বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণের পথে আছে, এমন সময়ে একটি কার্যকরি লজিস্টিকস খাত কেবল অগ্রাধিকার নয়, প্রয়োজন। আমাদের মেরিটাইম এক্সপারটিজ, গ্রিন | টেকনোলজি এবং ডিজিটাল উদ্ভাবন একত্রিত করে এই যাত্রায় বাংলাদেশের সঙ্গে থাকার জন্য নরওয়ে সবসময় প্রস্তুত।”
। নর্ডিক ব্যবসায়িক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে তানভীর মোহাম্মদ বলেন, “বাংলাদেশ যেন তার গতি বৃদ্ধি বজায় । রেখে উচ্চমানের বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে সেজন্য লজিস্টিকসকে বটলনেক থেকে সরিয়ে বাণিজ্যের । সহায়ক হিসেবে রূপান্তর করতে হবে। টেকসই সাপ্লাই চেইন এবং ডিজিটাল রূপান্তরে অভিজ্ঞতা থাকায় নর্ডিক । কোম্পানিগুলো এই যাত্রায় অংশীদার হতে আগ্রহী। একসাথে, আমাদের একটি প্রতিযোগিতামূলক, সহনশীল এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতমূলক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে।”
এইচএসবিসি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মো: মাহবুব উর রহমান বলেন, “বাংলাদেশের নেতৃস্থানীয় আন্তর্জাতিক ব্যাংক হিসেবে এইচএসবিসি বাংলাদেশ নর্ডিক করিডরের মধ্যে থাকা সমন্বয়গুলোকে সংযুক্ত করার জন্য প্রস্তুত। পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাণিজ্যিক পরিস্থিতিতে লজিস্টিকস আমাদের ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রতিযোগিতা নির্ভর করবে জাতীয় অবকাঠামো উন্নতির উপর- যেমন বন্দর ও অন্যান্য ক্ষেত্র। এসব জায়গায় সংস্কার, নির্বাচিত বেসরকারিকরণ এবং উন্নত মাল্টিমোডাল সংযুক্তি অপরিহার্য। আমরা একটি স্বল্প উন্নত দেশ থেকে মধ্য আয়ের দেশে উত্তরণের পথে এগোচ্ছি, এ সময় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
| বাংলাদেশের লজিস্টিকস রূপান্তরকে কল্পনা থেকে বাস্তবে পরিণত করার আহ্বান নিয়ে সেশনটি শেষ হয়। । রয়্যাল নরওয়েজিয়ান এম্ব্যাসি, এইচএসবিসি বাংলাদেশ এবং এনসিসিআই এই সংলাপ অব্যাহত রাখার, সহযোগিতা বৃদ্ধি করার এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো সমর্থন করার অঙ্গীকার করেন। এই পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতকে প্রতিযোগিতামূলক, সংযুক্ত এবং টেকসই করে গড়ে তুলতে সহায়ক হবে, যা দেশের বাণিজ্যকে আরো শক্তিশালী ও ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে তুলবে।