শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ বেলা ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোজাফফর আহমদ চৌধুরী মিলনায়তনে বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এন্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) কর্তৃক আয়োজিত “জনপরিসরে অদৃশ্য প্রতিবন্ধী নাগরিক: বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠনে আমাদের প্রত্যাশা” শীর্ষক একটি মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় বিভিন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের সংগঠনসমুহ, অন্যান্য ক্ষেত্রের প্রতিনিধিবৃন্দ, ছাত্র ও যুব সমাজ ছাড়াও সম্মানিত অতিথি বক্তা হিসেবে প্রখ্যাত লেখক, দার্শনিক, ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জনাব ফরহাদ মজহার, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, ব্র্যাক এর ডিজেবিলিটি ইনক্লুশন লিড জনাব মো: জাহিদুল কবির, তরী ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জনাব আশফাকউল কবির উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে মুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বি-স্ক্যান’র পরিচালক ইফতেখার মাহমুদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বি-স্ক্যান ও পিএনএসপি’র সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব। প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) ও সাইটসেভার্স’র সমতার বাংলাদেশ ক্যাম্পেইন এর সহযোগিতায় এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়।
প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি সমাজ ও রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি এবং উন্নয়নের ধারা এখনও নেতিবাচক ও সীমাবদ্ধ। স্বাধীনতার ৫২ বছরে বাংলাদেশ নানা উন্নয়নের পথে এগিয়ে গেলেও প্রতিবন্ধী মানুষদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কল্যাণমুলক কার্যক্রম থেকে অধিকার মুলক প্যারাডাইমশিফটের দিকে ধাবিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় বেগবান থাকলেও দৃশ্যত তা কচ্ছপ গতির। অপরদিকে দেশের জনপরিসরে অর্থাৎ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় প্রতিবন্ধিতা প্রশ্নটি নিয়ে কোন রকম বিতর্ক বা আলাপ করার প্রয়াস দেখা যায়নি। কিছু বিচ্ছিন্ন দাতা নির্ভর প্রকল্প ভিত্তিক কার্যক্রম দেখা গেলেও সেখানে মেইনস্ট্রিমিং-এর হার আশানুরূপ নয়। প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে গৃহিত উদ্যোগের ক্ষেত্রে সার্ভিস ডেলিভারি মডেল থেকে এখনও বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। আবার দক্ষতা উন্নয়নের প্রশ্নে প্রতিবন্ধী মানুষদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদান করাও যথার্থ নয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ে জনওকালতি উদ্যোগসমুহ লাল ফিতার দৌরাত্বে স্থবিরতার পরিচয় দিচ্ছে। প্রাপ্য অধিকার এবং ক্ষমতায়ন তরান্বিত করার লক্ষে্ প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের বাধা পেরিয়ে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ন্যায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা জনপরিসরে চর্চিত হওয়াকে সময়ের দাবি হিসেবে আলোকপাত করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তাগন তাদের মুল্যবান মতামত প্রকাশ করে যা বলেন –
তরী ফাউন্ডেশন এর নির্বাহী পরিচালক জনাব আশফাক কবির বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের তাদের নিজেদের মাঝেই বৈষম্য বিদ্যমান।এ বৈষম্য রোধ করা দরকার। একিভুত করতে হলে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব প্রদান করা উচিত সার্বজনীনগম্যতা নিশ্চিত করার ওপর। এছাড়াও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনের মধ্যে একতা খুবই দরকার এবং সংগঠনসমুহের ভবিষ্যত নেতৃত্ব তৈরি করা দরকার।
ব্র্যাকের জাহিদুল কবির বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের বদলানোর কিছু নেই, সমাজকে বদলে দিতে হবে। সরকারি আমলারা প্রতিবন্ধী মানুষদের বিষয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে কিন্তু প্রতিবন্ধী মানুষের তা আদৌ প্রয়োজন কিনা তা ভেবে দেখা দরকার।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজম বলেন, নারীবর্গ, কৃষকর্গের ন্যায় প্রতিবন্ধী বর্গের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছেনা। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারাটা মানবসভ্যতার একটি স্মারক। একটি রাষ্ট্র যখন তার যত বেশি নিজ জনগনকে সংবরণ করতে পারে, তখনই একিভুত সমাজে প্রতিবন্ধী মানুষের মর্যাদার চিত্ররেখা তরান্বিত হতে থাকে। তিনি আশা করেন, প্রতিবন্ধী মানুষের বর্গীকরণ, তাদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণ, জনপরিসরে তাদের বিষয়ে চর্চা উত্তোরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।
প্রখ্যাত দার্শনিক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক জনাব ফরহাদ মজহার বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রশ্নে তার একটি বিশেষ প্রতিশ্রুতি সর্বদা রয়েছে। একটি দেশের সার্বজনীনগম্যতার অবস্থা সেদেশের সামাজিক কাঠামোকে নির্দেশ করে। প্রতিবন্ধী মানুষের দাবিসমুহ আরো বেশি ছড়িয়ে দেওয়া দরকার, যাতে করে তাদের অধিকার আদায় করা যায়। প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি সবসময় তার সমর্থন রয়েছে।
মূল বক্তব্য উপস্থাপনায় নিম্নে উল্লেখিত সুপারিশমালা উপস্থাপন করা হয়:
১। প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে ন্যূনতম একজন প্রতিবন্ধী মানুষকে নিয়োগ করা এবং প্রতিবন্ধী মানুষকে সহ-উপদেষ্টা পদে নিয়োগ করা;
২। অনতিবিলম্বে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়ন অধিদফতর কার্যকর করা;
৩। প্রতিবন্ধী মানুষের সরকারি চাকরির নিয়োগের কোটা পূনর্মূল্যায়ন করা। সেক্ষেত্রে ৯ম থেকে দ্বাদশ গ্রেড (১ম শ্রেণী) পর্যন্ত ২% এবং ১৩তম থেকে ২০তম গ্রেড (২য় শ্রেণী) পর্যন্ত ৫% কোটা বরাদ্দ রাখা;
৪। প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রতিবন্ধিতার মাত্রা ভেদে ন্যূনতম ৫০০০ টাকা (মাসিক) ভাতা প্রদান করা;
৫। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বিষয়ক ফোকাল নিযুক্ত (দায়িত্ব বন্টনসহ) করা এবং তাদের তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা;
৬। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনতিবিলম্বে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে
স্থানান্তর করা;
৭। ঢাকাসহ সকল মেট্রোপলিটন শহরে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রবেশগম্য গণপরিবহন চালু করা এবং সড়ক, রেল এবং নৌপথে প্রতিবন্ধী মানুষ ও তার ১ জন সহকারিসহ (যদি থাকে) উভয়ের জন্য অর্ধেক ভাড়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;
৮। বিদ্যালয়, আদালতসহ সকল সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে বাংলা ইশারা ভাষার দোভাষী সেবা নিশ্চিত করা;
৯। রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী নিবন্ধনের শর্ত হিসেবে বিভিন্ন পদে ন্যূনতম ৫% পদ প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখা;
১০। সংবিধান সভা গঠন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষ এবং প্রতিবন্ধিতার ধরনের ভিত্তিতে জনসংখ্যার অনুপাতে ৫% আসন সংখ্যা সংরক্ষণ করা;
১১। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সকল অংশীজন সভায় প্রতিবন্ধী মানুষদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নির্দিষ্ট অংশীজন ভিত্তিক সভায় রাষ্ট্রের সবচেয়ে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিবন্ধী মানুষদের সাথে পৃথক সভা করা;
১২। এনজিও এফেয়ার্স ব্যুরো কর্তৃক অনিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন (ওপিডি)সমূহ নিবন্ধিত সংস্থার সাথে অংশিদারিত্বে কাজ করার উপর নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে তুলে নেওয়া; যাতে ওপিডিসমুহ প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ে একটি টেকসই সাংগঠনিক কাঠামো এবং রেজিস্টার্ড এনজিও’র অনুদানে/ পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের কর্মকান্ড পরিচালনা করতে সক্ষম হয়;
১৩। যে সকল প্রতিবন্ধী মানুষ সরকারি চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত বা ভাইভা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও নিয়োগ প্রাপ্ত হয়নি, তাদের দ্রুত নিয়োগের জটিলতা নিস্পত্তিকরণে ব্যবস্থা করা;
১৪। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জাতিসঙ্ঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ (Convention on the Rights of Persons with
Disability)-CRPD বিষয়ক পরীবিক্ষণ কমিটি কার্যকর করা;
১৫। ২০২৬ সালের মধ্যে সিআরপিডি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন জাতিসঙ্ঘে (বাংলাদেশের বিগত ৪ বারের প্রতিবেদন বকেয়া পড়েছে যা প্রতি ৪ বছর পর পর জমাদানের নিয়ম রয়েছে) জমা দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা;
১৬। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এবং নিওরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ সংস্কার করা, পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি উন্নয়নে কর্মপরিকল্পনাকে এসডিজি, সিআরপিডি, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং আইনসমূহকে বিবেচনায় নিয়ে পুনর মূল্যায়ন করে নতুনভাবে প্রণয়ন করা।