• ১৬ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১লা আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ৫ই রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

ঐতিহ্যবাহী মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত মে ১০, ২০২৬
ঐতিহ্যবাহী মহেশখালী আদিনাথ মন্দিরের পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা

​রাজীব দে

কক্সবাজার জেলার মহেশখালী দ্বীপে অবস্থিত সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থস্থান ঐতিহ্যবাহী আদিনাথ মন্দির। সম্প্রতি মন্দিরের প্রধান পুরোহিত রাহুল চক্রবর্তী ১০ই মে ২০২৬, রবিবার এক সাক্ষাৎকারে এই মন্দিরের পৌরাণিক উৎপত্তি এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বিস্তারিত বক্তব্য প্রদান করেছেন। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বাবার সেবায় নিয়োজিত রাহুল চক্রবর্তী ত্রেতা যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত মন্দিরের বিবর্তনের ইতিহাস তুলে ধরেন।

​রাহুল চক্রবর্তী জানান, আদিনাথ মন্দিরের ইতিহাস শুরু হয় ত্রেতা যুগে। লঙ্কাধিপতি রাবণ মহাদেবকে তুষ্ট করে বর প্রার্থনা করেছিলেন যে তিনি কীভাবে রামের সাথে যুদ্ধে জয়ী হতে পারেন। মহাদেব তখন তাকে কৈলাশ থেকে আদি শিবলিঙ্গ (আদিনাথ) লঙ্কায় নিয়ে গিয়ে রাজকীয়ভাবে পূজা করার পরামর্শ দেন। তবে শর্ত ছিল, লঙ্কায় পৌঁছানোর আগে এই শিবলিঙ্গ কোথাও মাটিতে স্পর্শ করা যাবে না। যেখানেই স্পর্শ হবে, সেখানেই তিনি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবেন।
​রাবণ যখন ময়নাক পর্বতের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তার তীব্র প্রস্রাবের বেগ অনুভূত হয়। পবিত্র শিবলিঙ্গ হাতে নিয়ে তিনি তা করতে পারছিলেন না দেখে এক সন্ন্যাসীকে এটি কিছুক্ষণ ধরে রাখার অনুরোধ করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পর ওই সন্ন্যাসী শিবলিঙ্গটি মাটিতে রেখে পূজা সম্পন্ন করে চলে যান। ফলে শর্তানুযায়ী আদিনাথ সেখানেই স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যান। রাবণ ফিরে এসে শত চেষ্টা করেও আর শিবলিঙ্গটি সরাতে পারেননি।

​প্রধান পুরোহিত জানান, প্রায় ৭০০-৭৫০ বছর আগে অত্র অঞ্চলে যখন জনবসতি গড়ে ওঠে, তখন নূর মোহাম্মদ শিকদার নামে একজন মুসলিম জমিদার এখানে বসবাস করতেন। একদিন তিনি শিকারে গিয়ে দেখেন তার একটি গাভী থেকে অলৌকিকভাবে আদিনাথ শিবলিঙ্গের ওপর দুধ ঝরছে। জমিদার শিবলিঙ্গটি কৌতূহলবশত তার প্রাসাদে নিয়ে যান। সেখানে এক রাখাল তলোয়ার ধার দিতে গেলে শিবলিঙ্গ থেকে রক্ত ও আগুনের স্ফূলিঙ্গ বের হতে শুরু করে।
​পরবর্তীতে জমিদার স্বপ্নে আদিষ্ট হন যে, শিবলিঙ্গটিকে তার পূর্বের স্থানে ফেরত পাঠিয়ে পূজার ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় তার অমঙ্গল হবে। জমিদার প্রথমে গুরুত্ব না দিলেও তার এলাকায় নানা আপদ-বিপদ দেখা দিলে তিনি ভীত হন। পরবর্তীতে স্বপ্নে দেখা সেই সন্ন্যাসীর (গোরক্ষনাথ) হাতে শিবলিঙ্গটি তুলে দিয়ে তিনি পূজার ব্যবস্থা করেন।

​রাহুল চক্রবর্তী উল্লেখ করেন, মহেশ্বরের (আদিনাথ) নামানুসারে এই দ্বীপের নাম হয় ‘মহেশখালী’ এবং যে সন্ন্যাসী (গোরক্ষনাথ) পূজা করেছিলেন, তার নামানুসারে মহেশখালী সদর এলাকার নাম হয় ‘গোরকঘাটা’। মুসলিম জমিদার নূর মোহাম্মদ শিকদারের বংশধরেরা এখনো গোরকঘাটা এলাকায় বসবাস করছেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।

​মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত অষ্টভুজা দুর্গা প্রতিমাটি নেপালের রাজা প্রায় ৭৫০ বছর আগে স্থাপন করেছিলেন। মহেশখালীতে সাধারণত প্রতিমা পূজা হয় না, ঘট পূজা করা হয়। তবে এই অষ্টভুজা দুর্গাই এখানে প্রধান আরাধ্যা দেবী। এছাড়া মন্দিরের পেছনে দুটি পুকুর রয়েছে যার জল লোনা সাগরের মাঝখানে হওয়া সত্ত্বেও ১২ মাসই মিষ্টি ও সুপেয় থাকে, যা এক বিস্ময়কর ঘটনা।
​পরিশেষে, প্রধান পুরোহিত রাহুল চক্রবর্তী এই মন্দিরের গুরুত্ব এবং বিশ্বজুড়ে এর সুনাম ও ঐতিহ্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

September 2026
S S M T W T F
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
2627282930