• ৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৩শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
আগুনবেলা

অনলাইনে চাঁদপুরের ইলিশ কেনার ফাঁদ: কুরিয়ার সার্ভিসের নামে অভিনব জালিয়াতি, চট্টগ্রামে নারী গ্রাহক প্রতারিত

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত জুন ৮, ২০২৬
অনলাইনে চাঁদপুরের ইলিশ কেনার ফাঁদ: কুরিয়ার সার্ভিসের নামে অভিনব জালিয়াতি, চট্টগ্রামে নারী গ্রাহক প্রতারিত

সারাদেশে মাছের রাজা ইলিশের ব্যাপক চাহিদাকে পুঁজি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এক শ্রেণীর সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারক চক্র। সম্প্রতি ফেসবুকে ‘চাঁদপুরের টাটকা রাজা ইলিশ মাছ’ নামক একটি ভুয়া পেজ খুলে কুরিয়ার সার্ভিসের প্রতিনিধি ও পেজ মালিক সেজে অভিনব জালিয়াতির ফাঁদ পাতা হয়েছে। এই চক্রের খপ্পরে পড়ে কয়েক দফায় মোট ৭,০৯৮ টাকা হারিয়ে চরম ক্ষোভ ও হয়রানির শিকার হয়েছেন চট্টগ্রামের এক স্থায়ী বাসিন্দা (নারী গ্রাহক)। সামাজিক সম্মানহানির ভয়ে ওই ভুক্তভোগী নারী নিজের নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক। গত শনিবার (৬ জুন, ২০২৬) দুপুর বেলা এই সুপরিকল্পিত জালিয়াতির ঘটনাটি ঘটে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী ওই নারী গ্রাহক ফেসবুক মেসেঞ্জারে চ্যাট করে ইলিশ মাছের অর্ডার করেছিলেন। প্রতারক চক্রটি নিজেদের ‘এজে আর কুরিয়ার সার্ভিস’-এর লোক এবং অনলাইন পেজের মালিক দাবি করে একটি সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেট হিসেবে কাজ শুরু করে।
মাছ ডেলিভারি দেওয়ার কথা বলে প্রথমে গ্রাহকের কাছ থেকে পেজের নির্দিষ্ট নম্বরে ডেলিভারি চার্জ বাবদ ৩০০ টাকা নেওয়া হয়। এরপর ইলিশ মাছ কুরিয়ার থেকে কন্ডিশনে রিসিভ করার কথা বলে প্রথম দফায় ১৭০০ টাকা লুটে নেয় চক্রটি। টাকা পাওয়ার পরপরই শুরু হয় আসল জালিয়াতি। চক্রের একজন সদস্য গ্রাহককে ফোন করে বলে,

“আপনার মোবাইলে একটি কোড যাবে, কোডটা জানাবেন।”গ্রাহক সরল বিশ্বাসে কোডটি জানানোর পর অনলাইন ইলিশ মাছ ব্যবসায়ী নতুন চালাকি শুরু করে। তারা জানায়, “ম্যাম, আপনি চার সংখ্যার কোডের মধ্যে ইংরেজি শব্দ ‘0’ (শূন্য)-এর জায়গায় ইংরেজি ‘O’ (ও) বলেছেন, তাই সার্ভারে আপনার পেমেন্ট লক হয়ে গেছে।”

এই কথিত সার্ভার ভুলের অজুহাত দেখিয়ে গ্রাহককে এক প্রকার ট্র্যাপে ফেলে দ্বিতীয় দফায় ১৬৯৯ টাকা দাবি করা হয়। নিরুপায় হয়ে ভুক্তভোগী নারী গ্রাহক প্রতারকদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে (০১৭৮৭-৫০০৭৫৬) টাকা পাঠান। কিন্তু প্রতারক চক্রটি এখানেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা আবারও সার্ভার ত্রুটির কথা বলে গ্রাহকের কাছ থেকে তৃতীয় দফায় ৩৩৯৯ টাকা হাতিয়ে নেয়।

ভুক্তভোগী গ্রাহকের পাঠানো হিসাব অনুযায়ী মোট টাকার পরিমাণ:
ডেলিভারি চার্জ = ৩০০/- টাকাপ্রথম দফা (কুরিয়ার কন্ডিশন) = ১৭০০/- টাকা
দ্বিতীয় দফা (সার্ভার লক খোলার অজুহাত) = ১৬৯৯/- টাকা
তৃতীয় দফা = ৩৩৯৯/- টাকা
সর্বমোট হাতিয়ে নেওয়া অর্থ = ৭,০৯৮/- টাকা

চতুর্থবার যখন তারা আবারও ৫০৯৯ টাকা দাবি করে, তখন ভুক্তভোগী গ্রাহকের মনে তীব্র সন্দেহের দানা বাঁধে এবং তিনি আর কোনো টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান।

কুরিয়ার সার্ভিসের নাম ব্যবহার ও ভুয়া ঠিকানা টাকা দেওয়ার পর মাছ না পেয়ে সন্দেহ দূর করতে ওই নারী গ্রাহক চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে অবস্থিত প্রকৃত ‘এজে আর কুরিয়ার সার্ভিস’-এর শাখায় খোঁজ নেন। তখন খাতুনগঞ্জ শাখা কর্তৃপক্ষ গ্রাহককে তাদের চট্টগ্রামের সকল শাখার একটি তালিকা দেখায় এবং নিশ্চিত করে যে, চট্টগ্রামের অলংকার মোড়ে এজে আর কুরিয়ার সার্ভিসের কোনো শাখাই নেই। কুরিয়ার কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, “আমাদের নাম ব্যবহার করে কোনো প্রতারক চক্র আপনাকে ফোন করেছে। আমরা ইলিশ মাছ দেব বলে কোনো গ্রাহককে ফোন করিনি। আপনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।”
পরবর্তীতে ওই নারী গ্রাহক মাছ পাওয়ার আশায় ইলিশের পেজ নম্বরে (০১৭১০-৮১০২৪৫) ফোন করলে তারা সুর বদলে ফেলে বলে, “ম্যাম, আমরা অলংকার মোড়ে এজে কুরিয়ার সার্ভিস না, আমাদেরটা হচ্ছে এজে কুরিয়ার পরিবহন সার্ভিস।” এভাবে তারা ক্রমাগত মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিতে থাকে।

জাতীয় ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ‘প্রেজেন্ট টাইমস’ (Present Times) -এর বিশেষ প্রতিনিধি রাজীব দে সমস্ত লেনদেনের ডকুমেন্টস ও স্ক্রিনশট হাতে পাওয়ার পর ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে নামেন।
প্রথম কল (পেজের নম্বরে):রবিবার (৭ জুন) সংবাদকর্মী রাজীব দে নিজে ক্রেতা সেজে পেজের নম্বরে (০১৭১০-৮১০২৪৫) ফোন করেন। তখন অপরপ্রান্ত থেকে ‘লেদু’ নামের এক ব্যক্তি পরিচয় দিয়ে বলে তাদের office চাঁদপুর বাজারে, দোকান নং ১২।

দ্বিতীয় কল (কুরিয়ার পরিচয়দানকারী নম্বরে): ওইদিন বিকেল ৫টার সময় এজে কুরিয়ার সার্ভিসের স্টাফ সেজে প্রতারণা করা অপর একটি বিকাশ নম্বরে (০১৭৮৭-৫০০৭৫৬) ফোন করেন সংবাদকর্মী। এবার অপরপ্রান্ত থেকে নিজেকে ‘রাসেল’ নামে পরিচয় দেওয়া হয়। সাংবাদিক যখন ভুক্তভোগী নারী গ্রাহকের পরিচয় দিয়ে টাকা ফেরত চান, তখন রাসেল জানায় তারা চট্টগ্রাম অলংকার মোড়ে হানিফ কাউন্টার সংলগ্ন অফিসে আছে এবং সেখানে এসে টাকা ফেরত দেবে। কিন্তু সাংবাদিক যখন চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন যে অলংকার মোড়ে এজে কুরিয়ারের কোনো শাখাই নেই, তখন ভুয়া স্টাফ রাসেল ক্ষিপ্ত হয়ে সংবাদকর্মীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল শুরু করে এবং লাইন কেটে দেয়। পরবর্তীতে এই নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
বর্তমানে ভুক্তভোগী গ্রাহকের বিকাশে টাকা পাঠানোর সমস্ত ডকুমেন্টস, স্ক্রিনশট এবং লিখিত হিসাব বিবরণী জাতীয় ইংরেজি দৈনিক Present Times’ এর বিশেষ প্রতিনিধির আর্কাইভে সংরক্ষিত রয়েছে।

অনলাইনে ‘চাঁদপুরের টাটকা রাজা ইলিশ মাছ’ পেজের এই প্রতারক চক্রটি ফেসবুক ও মেসেঞ্জারে চ্যাট করে এবং বিভিন্ন ভুয়া বিকাশ নম্বর ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষকে ঠকাচ্ছে। এই অসাধু চক্র ও তাদের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অতিসত্বর তথ্যপ্রযুক্তি আইনের আওতায় যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে।
একই সাথে সাধারণ ফেসবুক ব্যবহারকারী ও অনলাইন ক্রেতাদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, এই পেজটির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই বহু মানুষ প্রতারিত হয়েছেন। তাই অনলাইন কেনাকাটায় এই পেজটি (এবং এর সাথে যুক্ত বিকাশ নম্বর ০১৭৮৭-৫০০৭৫৬, ও ফোন নম্বর ০১৭১০-৮১০২৪৫) থেকে সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও সাবধান থাকার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে।

June 2026
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930