পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যেও সারাদেশে প্রতিমা ভাঙচুর হচ্ছে এ যেন থামছে না।
পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যেও সারাদেশে প্রতিমা ভাঙচুর হচ্ছে এ যেন থামছে না।
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৪
হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সারা দেশের পূজামণ্ডপ গুলোতে এখন প্রতিমা বানানোর কাজ চলছে মহাসমারোহে। কিন্তু এরই মধ্যে দেশের কয়েকটি এলাকায় প্রতিমা ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে যা সত্যিই সনাতনী সম্প্রদায় এর জন্য দুঃখজনক।
সনাতনী সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, আমাদের সাথে প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষণিক মত বিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যাপারে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে। কিন্তু তারপরও ঘটনা ঘটছে ঘটনা থামছে না চলছে প্রতিনিয়ত।
ময়মনসিংহের গৌরীপুরের মধ্যবাজারে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে৷সর্বশেষ বৃহস্পতিবার ভোর রাত চারটার দিকে ওই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বৃহস্পতিবার সকালে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ।
গৌরীপুর মধ্যবাজার পূজা কমিটির সাবেক সভাপতি পীযূষ রায় , ২০ দিন ধরে মন্দিরটিতে প্রতিমা বানানোর কাজ চলছিল৷ শুধু প্রতিমার রঙের কাজ করা বাকি ছিল৷ পূজা শুরুর এক দিন আগে মন্দির থেকে মণ্ডপে প্রতিমা নেওয়ার কথা ছিল৷ ‘‘কিন্তু বৃহস্পতিবার ভোর রাত চারটার দিকে এক তরুণ মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুর করেন৷ সেখান থেকে ভাঙা প্রতিমা নিয়ে যাওয়ার সময় মন্দিরের পাশের বাড়ির ডলি রানি দেখতে পেয়ে চিৎকার করেন৷ এ সময় অখিল চন্দ্র বিশ্বশর্মা ও বিপুল ঘোষ এসে তরুণকে ধরে ফেলেন৷ পরে সকালে এসে পুলিশ নিয়ে যায়,” বলে জানান তিনি৷ পীযূষ রায় জানান, আগে তাদের মন্দিরে কখনো প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি৷
ফরিদপুরে ১৫ সেপ্টেম্বরে দুইটি মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে৷ ফরিদপুরের ভাঙ্গা বাজারের গুড়পট্টি এলাকায় অবস্থিত ‘ভাঙ্গা বাজার সার্বজনীন হরি মন্দির’ এবং ভাঙ্গা থানার সামনে অবস্থিত ‘ভাঙ্গা সার্বজনীন কালি মন্দির’-এ এই ঘটনা ঘটে৷ ৭৫ বছর ধরে ওই মন্দিরে দুর্গাপূজা হচ্ছে৷ মন্দির দুইটিতে প্রতিমা ভাঙার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ প্রথমে তাকে ভারতীয় নাগরিক বলে প্রচার চালিয়েছিল৷ পরে অবশ্য দেখা যায় তিনি ঐ এলাকার বাসিন্দা এবং বাংলাদেশি নাগরিক৷
বরিশাল এর বরগুনা সদর গত ২০ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে উপজেলার ফুলঝুড়ি ইউনিয়নের গলাচিপা গ্রামের সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর করা হয়৷ মন্দিরটির সভাপতি বিপুল সমাদ্দার জানান, ‘‘রাতের গভীরে মন্দিরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা এই ঘটনা ঘটিয়েছে৷ সকালে মন্দিরে গেলে বিষয়টি নজরে আসে৷ পরে সবাইকে জানানো হয়৷ এই ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে৷ চার-পাঁচটি প্রতিমা ভাঙা হয়েছে মন্দিরে৷”
দীপঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘‘আমরা সরকারের সব পর্যায়ে বৈঠক করেছি৷ তারা আমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে আশ্বস্ত করছেন৷ কিন্তু আমরা এখনো আশ্বস্ত হতে পারছি না৷ আর এটা শুধু পুলিশি নিরাপত্তা দিয়ে বন্ধ করা সম্ভব নয়৷ এর জন্য দরকার সমাজের সব মানুষের আন্তরিকতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন৷”
কেন্দ্রীয় পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, ‘‘উত্তরায় যেটা হয়েছে, আমরা আলোচনার ভিত্তিতেই মাঠ থেকে পূজা আরেক জায়গায় সরিয়ে নিয়েছি৷ এটা নিয়ে আর কোনো সমস্যা নাই৷ আর ধানমন্ডির কলাবাগান মাঠে পূজা বন্ধ করেছিলেন দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র তাপস৷ এবার ধানমন্ডির কলাবাগান মাঠে পূজা হবে৷”
উত্তরা ১৭ নং সেক্টরের বৃন্দাবন ইসকন মন্দির এর পাশে সার্বজনীন পূজা মন্দিরের সভাপতি বলেন, শান্তিপূর্ণ পূজার কর্মযজ্ঞ চলছে আমরা খুব শান্তিপূর্ণ ভাবে এবার পূজা সম্পন্ন করব। দূর্গাপূজা যে উদ্দেশ্য করে থাকি ও অশুভ শক্তির বিনাশ হউক শুভ শক্তির উদয় হোক এই কামনা করি। মা দুর্গা যেভাবে আসুরিক শক্তির বিনাশ করে মানুষের ভিতর দেবত্ববোধ জাগ্রত করেছিলেন। আমরা ও আশা করি মানুষের ভিতর সেই আসুরিক শক্তি বিনাশ হয়ে দেবত্ববোধ জাগ্রত হোক।এই কামনায় আমরা দেবী মহামায়ার পূজার আয়োজন করছি সনাতনী সম্প্রদায়।
বাংলাদেশ জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সুকুমার চৌধুরী কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন,আমরা হিন্দুরা দুর্গাপূজা করি শান্তির জন্য।মা দূর্গা অসুরকে বিনাশ করে সকলের জন্য শান্তির বার্তা বয়ে এনেছে।হিন্দু ধর্ম শান্তির ধর্ম আমরা শান্তিতে বিশ্বাসী।যারা প্রতিমা ভাংচুরের সাথে যারা জড়িত।সে সকল দুষ্কৃতিকারীদের গ্রেপ্তার করে কঠিন শাস্তির ব্যবস্হা করুন যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের জঘন্যতম কাজ করার সাহস যেন কেউ না দেখায়।
রাজনৈতিক পট পরিবর্তন এর সাথে সাথে সারাদেশে ৫ আগস্ট থেকে এপর্যন্ত আমরা মন্দিরে হামলাসহ নানা ধরনের হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ পেয়েছি দেড় হাজারের থেকে ও বেশি৷”।অন্তত প্রতিমা ভাংচুর এর একটি বিচার করে দেখান সনাতনী সম্প্রদায়কে যাতে আর কোনদিন কেউ সাহস না পায় এ ধরনের ঘৃণ্যতম অপরাধ করার জন্য।
ঢাকা মহানগর উত্তরা পশ্চিম শাখা পূজা কমিটির সহ-সভাপতি সন্দীপ কুমার বলেন, পূজার আয়োজন সম্পন্ন করতে তারা উত্তরার মুগ্ধ চত্বর অথবা উত্তরা ১১ নং সেক্টর জমজম টাওয়ার সংলগ্ন খালি জায়গার প্রস্তাব দিয়েছে। আয়োজনের সার্বিক সুবিধা বিবেচনা মুগ্ধ চত্বর নির্ধারণ হলে ভালো হয়।
এসময় তিনি জানান, ‘‘সারাদেশে কতগুলো মণ্ডপে প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে তার সঠিক হিসাব আমাদের কাছে এখনো নেই৷ তবে আমরা অভিযোগ পাচ্ছি৷ অভিযোগগুলো যাচাই বাছাই করে আমরা কয়েকদিনের মধ্যেই তথ্য প্রকাশ করব৷ কবে ৫ আগস্ট থেকে এপর্যন্ত আমরা মন্দিরে হামলাসহ নানা ধরনের হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ পেয়েছি দেড় হাজারের বেশি৷”
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা বলেন, ‘‘আমরা প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাদের দূর্গাপূজার সার্বিক নিরাপত্তা চেয়েছি৷ এখন পর্যন্ত সরকার যে ব্যবস্থা নিয়েছে তাতে আমরা আশ্বস্ত৷”
তিনি বলেন, ‘‘এবার সরকারি হিসাবে ৩২ হাজার ৬৬৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে৷ তবে আমরা বলছি ৩২ হাজার প্লাস৷ আমরা চেষ্টা করছি যেন পূজা উৎসব মুখর আনন্দঘন পরিবেশে হয়৷”হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে যেন ভয়-ভীতি কাজ না করে সবাই মিলে যেন পূজার আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
পুলিশ এর পক্ষ থেকে পূজায় তিন স্তরের নিরাপত্তার কথা বলছে পুলিশ৷ পূজার আগে, পূজার সময় ও পূজার পরে৷ পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) ইনামুল হক সাগর বলেন, ‘‘এরই মধ্যে পূজা ও পূজা মণ্ডপের প্রথম স্তরের নিরাপত্তার কাজ শুরু হয়ে গেছে৷ আমাদের অবস্থান হলো, এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে কেউ যেন পূজাকে কেন্দ্র করে অশান্তির চেষ্টা না করতে পারে৷ সেজন্য আমরা কঠোর অবস্থানে আছি৷ কেউ চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে৷”
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের আমরা আইনের আওতায় আনছি৷ ওইসব মন্দিরে বিশেষ নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে৷ আর নতুন করে যাতে কোনো ঘটনা না ঘটে সেজন্য আমরা নজরদারি আরো বাড়িয়েছি৷ আর কারুর কাছে যদি এই ধরনের কোনো তথ্য থাকে আমাদের জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি৷ আমরা তথ্য পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নেব৷ এই ব্যাপারে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি৷”
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট দীপঙ্কর ঘোষ বলেন, ‘‘আসলে আমরা প্রতিটি হামলার বিচার চাই৷ এপর্যন্ত যত ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর বিচার হলে এই পরিস্থিতি হতো না৷”