ঢাকায় শিশু যৌন শোষণের বিস্তৃস্ত মাত্রা উন্মোচন করল দুই জাতীয় গবেষণা
ঢাকায় শিশু যৌন শোষণের বিস্তৃস্ত মাত্রা উন্মোচন করল দুই জাতীয় গবেষণা
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ২৪, ২০২৫
ঢাকার তিনজন ভাসমান ছেলে শিশুর একজন যৌন শোষণের শিকার-নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য
ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষায় জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানাল নতুন গবেষণা
দেশের পথশিশুদের ওপর চলমান যৌন শোষণ ও সুরক্ষা ঘাটতির নতুন প্রমাণ উন্মোচিত
গুরুতর শোষণ ও ঝুঁকির মুখে দেশের ভাসমান শিশুরা, নতুন গবেষণার তথ্য।
ঢাকার রাস্তায় বসবাসকারী প্রায় প্রতি তিনজন ছেলের মধ্যে একজন বেঁচে থাকার তাগিদে যৌন শোষণের শিকার হয়েছে বলে নতুন জাতীয় গবেষণায় জানা গেছে। দ্য ফ্রিডম ফান্ড সরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় শিশু সুরক্ষা সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় পরিচালিত এই গবেষণা ফলাফল আজ প্রকাশ করেছে। Through Her Eyes এবং Beneath the Surface শীর্ষক দুটি প্রধান গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত। ছিলেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজসেবা অধিদপ্তর, জাতিসংঘ সংস্থা, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় এনজিও এবং। । সারভাইভার নেতৃবৃন্দ।
ঢাকার ৬৩টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও তিনটি প্রধান পতিতালয় সম্প্রদায়জুড়ে পরিচালিত এই গবেষণাগুলোতে জরিপ,। গুণগত সাক্ষাৎকার ও হটস্পট ম্যাপিং ব্যবহৃত হয়েছে। এগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকায় শিশু যৌন শোষণের (CSEC) সবচেয়ে বিস্তৃত ও প্রমাণসমৃদ্ধ চিত্র তুলে ধরে। গবেষণা থেকে জানা যায়, নিয়োগ, জোরপূর্বক শোষণ, পারিপার্শ্বিক ঝুঁকি এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল সহায়তা ব্যবস্থার অভাবসহ নানা দিক পূর্বে এভাবে নথিভুক্ত হয়নি। তথ্য অনুযায়ী, শোষণমূলক ঘটনা পার্ক, টার্মিনাল, নদীপোর্ট এবং সড়কের ধারের কর্মস্থলসহ জনসমাগম এলাকায়; এবং পতিতালয়ে-যেখানে সারভাইভাররা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ ও নির্যাতনমূলক পরিবেশের কথা জানিয়েছেন-দুই জায়গাতেই ব্যাপকভাবে ঘটে থাকে।
“মেয়েরা ও ছেলেরা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে কিন্তু সমানভাবে নির্মম শোষণের মধ্যে পতিত হচ্ছে,” বলেন দ্য ফ্রিডম ফান্ড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ খালেদা আক্তার। “মেয়েদের প্রতারণা, ভালোবাসা বা নিরাপত্তার ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে টেনে আনা হয়; আর ছেলেদের ক্ষুধা, বাসস্থানের অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতার সুযোগ নিয়ে শোষণ করা হয়। এই তথ্যগুলোকে অবশ্যই আরও শক্তিশালী নীতি, পর্যান্ত বিনিয়োগ এবং শিশু সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে রূপান্তর করতে হবে।”
গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ মেয়ে কিশোরী বয়সেই মিথ্যা বিয়ের প্রতিশ্রুতি, ভালো কাজের প্রলোভন বা আবেগিক প্রতারণার মাধ্যমে পাচারকারীদের হাতে পড়ে। একবার পতিতালয় বা রাস্তা-কেন্দ্রিক শোষণের চক্রে ঢুকে গেলে তাদের । চলাফেরায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয় এবং নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন এবং অভ্যন্তরীণ অভিবাসনকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অনেকে কর্মসংস্থান বা ঘরোয়া সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসতে গিয়েই শোষণের জালে পড়ে।।
ছেলেদের ওপর পরিচালিত গবেষণাটি সমানভাবে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ১২-১৭ বছর বয়সী ছেলেরা জানান যে তারা প্রতিদিন খাদ্য, নিরাপদ ঘুমের স্থান এবং প্রাপ্তবয়স্কদের হয়রানি থেকে বাঁচার লড়াই করে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছেলে খাবার, আশ্রয় বা অল্প টাকার বিনিময়ে প্রাপ্তবয়স্কদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য হয়েছে। এসব ঘটনা প্রায়ই ঘটে পার্ক, বাসস্ট্যান্ড, বাজার এলাকা বা নির্জন রাস্তার কোণে। গবেষণা নির্দেশ করে যে ছেলেরা শিশু সুরক্ষা আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত এবং তাদের জন্য উপযোগী কোনো আশ্রয়কেন্দ্র, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বা পুনর্বাসন ব্যবস্থা বাস্তবে নেই।
“এই গবেষণাগুলো আমাদের এমন সব ঘাটতি দেখাচ্ছে, যা দ্রুত সমাধান করা জরুরি,” বলেন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. সাইদুর রহমান খান। “সরকারের পরিচালিত আশ্রয়কেন্দ্র, আইনি সহায়তা ও পুনর্বাসন সুবিধা থাকলেও, গবেষণা স্পষ্ট করে দেখাচ্ছে যে আমাদের আরও বিস্তৃত কাঠামো, ট্রমা-সচেতন সেবা এবং ছেলে ও মেয়েদের ভিন্ন প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া সুনির্দিষ্ট হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সমাজসেবা অধিদপ্তর এই সুপারিশগুলোকে চলমান। সংস্কারের সঙ্গে একীভূত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কলঙ্ক, ভয় এবং প্রতিশোধের আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী তাদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে না। অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় তারা আশ্রয়কেন্দ্র, বিদ্যালয় বা সামাজিক সুরক্ষা সেবায় প্রবেশ করতে পারে না। ছেলেদের ওপর করা হটস্পট ম্যাপিংয়ে টার্মিনাল, বস্তি, বাজার-সংলগ্ন এলাকা এবং নদী ঘাটকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা | হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা লক্ষ্যভিত্তিক আউটরিচ প্রোগ্রাম ডিজাইনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মমতাজ আহমেদ এনডিসি, শিশুদের বাণিজ্যিক যৌন। শোষণ (CSEC) প্রতিরোধে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং বলেন, “একটি উন্নত সেফ হাউস এবং সমাজকল্যাণ ব্যবস্থা থাকাটা জরুরি এবং এগুলোর উন্নয়নের জন্য আমরা আপনাদের পরামর্শ চাই।”
| সারভাইভার লিডার মোছা. ফরিদা পারভীন সহায়ক নীতি, বিশেষ করে পরিচয়পত্র ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত নীতির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “পরিচয় মানে মর্যাদা। আমাদের অনেকেই স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা, এমনকি মর্যাদাপূর্ণ কবরস্থানেও প্রবেশ করতে পারতাম না। আজ আমরা দাঁড়িয়ে আছি কারণ কিছু প্রতিষ্ঠান আমাদের ওপর বিশ্বাস করেছে। কিন্তু এখনো হাজারো শিশু সেই সহায়তার অপেক্ষায় আছে।”।
গবেষণাগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ে ঝুঁকি শনাক্তকরণ, শক্তিশালী শিশু সুরক্ষা কমিটি, সমন্বিত রেফারেল সিস্টেম, পরিবারভিত্তিক সহায়তা মডেল, কমিউনিটি-ভিত্তিক সচেতনতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও বাড়তি জীবনযাত্রার খরচ, অভ্যন্তরীণ অভিবাসন এবং কিশোরদের সীমিত সুযোগগুলো-যা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে-এসব মোকাবিলায় সামাজিক সুরক্ষা ও শিক্ষা-সম্পর্কিত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য ফ্রিডম ফান্ড জানিয়েছে যে শিশু সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োেগ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য সুফল এনে দেয়, এবং বাংলাদেশে অগ্রগতি অর্জনে সরকার, সিভিল সোসাইটি, সারভাইভার নেতৃত্বাধীন সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সমন্বয় অপরিহার্য। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায় যে তারা প্রযুক্তিগত সহায়তা, নীতিনির্ধারণ এবং কমিউনিটি-কেন্দ্রিক উদ্যোগ সম্প্রসারণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যাতে বাংলাদেশের কোনো শিশু পিছিয়ে না থাকে।