৬৬ বছর ধরে আপামর জনসাধারণের খাদ্যসেবায় নিয়োজিত মতিঝিলের দেশবন্ধু সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্ট
৬৬ বছর ধরে আপামর জনসাধারণের খাদ্যসেবায় নিয়োজিত মতিঝিলের দেশবন্ধু সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্ট
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৪
রিপোর্ট- রাজীব তাজ
প্রথম ধারার ব্রিটিশ বিরোধী বিখ্যাত বিপ্লবী নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ কে চেনে না, এমন কাউকে পাওয়া বিরল। ভারতবর্ষের সেই বিখ্যাত-বরেণ্য মানুষের নামে অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলে ইত্তেফাকের মোড়ে ১৯৫৮ সালে একটি সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্টের শুভ সূচনা ঘটে। নাম হয় “দেশবন্ধু সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্ট।” ছোট আঙ্গিক বিন্যাস এবং প্রাচীন ঘরানার হলেও এর খাবারের মান এবং স্বাদ অতুলনীয়। বিশেষ করে খাদ্য উপাদানে ব্যবহৃত মসলাগুলো উন্নত মানের, বাছাইকৃত সেরা। সুদূর অতীত থেকে এই আধুনিক সময়েও জন-মানুষের খাওয়ার সুবিধার্থে খুব সহনীয় মূল্যে সুস্বাদময় সকালের নাস্তা, দুপুরের খানাপিনা ও বিকেলের নাস্তা পরিবেশন করে আসছে। প্রতিদিন সকাল ৭ টায় শুরু হয়ে রাত ১০ টা অবধি চলে রেস্টুরেন্টটি।
ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় সব মানুষদের পদচিহ্ন পড়েছে এই রেস্টুরেন্টটিতে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে বরেণ্য সব রাজনৈতিক নেতা, শিল্পী-সাহিত্যিক, লেখক, আইনজীবী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়, তারকা নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, খেলোয়াড় সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার খাদ্যপ্রেমীদের মিলন মেলা ছিল এই খাবারের দোকানটি। উল্লেখযোগ্য নামের মধ্যে রয়েছে- ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, নায়ক রাজ-রাজ্জাক, নায়িকা শাবানা, সুজাতা- আজিম, কবরী, আনোয়ার হোসেন, খলিল; খেলার জগতের বিখ্যাত সব ফুটবলার যেমন- কাজী সালাহউদ্দিন, বাদল রায়, আসলাম, চুন্নু, ইউসুফ সহ অনেকে; গানের জগতের তারকা যেমন- আবিদা সুলতানা রফিকুল আলম দম্পতি, সুবীর নন্দী, রথীন্দ্রনাথ রায় এবং ওরে নীল দরিয়া খ্যাত আব্দুল জব্বার সহ বিভিন্ন ঘরানার বিপ্লবী নেতারা সবাই কমবেশী এই দেশবন্ধুতে বসে খাবার ভোগ করেছেন। আজও নিয়মিত ভিত্তিতে বাফুফে, এফডিসি, আবাহনী ক্লাব, ব্রাদার্স ক্লাব, মোহামেডান ক্লাব সহ ঢাকার অন্যান্য ক্লাবগুলোতে এখানকার পার্সেল খাবার প্রতিদিন যায়। ঢাকার বাইরের দূর দুরান্তের জেলা থেকে খাদ্যপ্রেমীরা এখানে আগমণ করে। ভারতের কলকাতা থেকেও এখানে অনেকেই খেতে আসেন। দেশবন্ধু সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্ট তাই ইতিহাসে লিখে রাখার মতই একটি নাম।
এবার এদের খাবারের কিছু গুণকীর্তন করা যাক। পাচঁফোড়ন দিয়ে রান্নাকৃত কয়েক প্রকার সবজি মিশ্রিত ভাজির স্বাদ মুখে লেগে থাকে। সাথে থাকে মুচমুচে পরাটা কিংবা গরম গরম লুচি। ডাল, ডিম সব সময় পাওয়া যায়। মিষ্টি পছন্দকারীদের জন্য আছে সুজির হালুয়া, আদি রসগোল্লা, দধি, নরম তুলতুলে ছানার জিলাপী সহ নানান পদের মিস্টি। চিরায়ত বাংলা খাবার- ভাত, মাছ, মুরগী, খাসীর আইটেম, ডাল, সবজি ও গোশ-খিচুড়ীর স্বাদ উল্লেখযোগ্য। রুই-কাতল মাছের মুড়িঘণ্ট বিশেষ এক পদ।
স্মার্ট বাংলাদেশের সময়কালে এসেও পুরনো নকশার আদল দেশবন্ধু সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্টের অতীত ঐতিহ্য ও সকীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যতদিন সম্ভব এই ধাঁচেই চলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন বর্তমান কর্ণধার শ্রী শ্যামল গোপ। তিনি আমাদেরকে জানান- ” আমার স্বর্গীয় পিতা শচী মোহন গোপ জনপ্রিয় ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী নেতা চিত্তরঞ্জন দাসের নামে এই রেস্টুরেন্টের নামকরণ করেন। এই থেকে অদ্যবধী সবাই দেশবন্ধু সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্ট নামেই চেনে। আমার পিতা প্রয়াত হওয়ার পর থেকে আমি এই রেস্টুরেন্টের হাল ধরি। যুগের অনেক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, কিন্তু তারপরেও খাবারের মানের ক্ষেত্রে কোন ধরণের ছাড় দেইনি। যতদিন বেঁচে থাকি, দেশবন্ধু সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্ট খাবারের মানের সাথে আপোষহীন হয়ে থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস।”
শ্রী শ্যামল গোপের ৫০ বছরের পুরনো বন্ধুবর মহসীন কবির কাজল কিছু চমকপ্রদ তথ্য সংযুক্ত করেন। তার মতে- “দেশবন্ধু সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্টের খাবারের মান অসাধারণ, কারণ খাদ্য উপাদান দৈনিক বাজারকৃত, সতেজ ও টাটকা। প্রতিদিনের খাবার প্রতিদিন শেষ হয়ে যায়। কিছু খাবার যেমন- লুচি, পরটা, ভাজি ইত্যাদি উদ্বৃত্ত থাকলেও তা রেস্টুরেন্টের পাশের বাগানের বানর- হনুমানদের নিত্য সকালে আপ্যায়ন করা হয়।” এভাবেই প্রতিদিন এগিয়ে চলছে দেশবন্ধু সুইটমিট এন্ড রেস্টুরেন্ট। ইতিহাসের অংশ হতে চাইলে আপনিও একবার খেয়ে আসুন বিখ্যাত এই রেস্টুরেন্টটিতে।