• ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৩ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৮ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

হিন্দু সম্প্রদায়ের মহাসমাবেশে লাখ লাখ মানুষের সমাগম জনসমুদ্রে পরিণত চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৫, ২০২৪
হিন্দু সম্প্রদায়ের মহাসমাবেশে লাখ লাখ মানুষের সমাগম জনসমুদ্রে পরিণত চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে

রাজীব দে/ঢাকা

সনাতনী সম্প্রদায়ের বিশাল মহাসমাবেশে চট্টগ্রামের লালদিঘির ময়দানে বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ও পুণ্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী বলেছেন, ‘যদি এই দেশ থেকে আমাদের উচ্ছেদ করে কেউ শান্তিতে থাকতে চান, তাহলে এটা আফগানিস্তান-সিরিয়া হবে। গণতান্ত্রিক শক্তি থাকবে না, সাম্প্রদায়িকতার অভয়ারণ্য হবে।’

লালদীঘির মাঠে বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের মহাসমাবেশে এসময় তিনি এসব কথা বলেন।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর মন্দির, হিন্দু বাড়িঘরে হামলা, শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগের অভিযোগ করে এর প্রতিবাদে এবং আট দফা দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ মহাসমাবেশ আয়োজন করা হয়। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

সনাতনীরা মিছিল সহকারে বিভিন্ন স্হান থেকে লালদিঘি এলাকায় সমবেত হতে শুরু করেন সমাবেশে যোগ দেয়ার জন্য। শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) বিকালে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দানে বাংলাদেশ সনাতন জাগরণ মঞ্চের গণসমাবেশে চট্টগ্রাম শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলা থেকে সনাতনীরা মিছিল নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে গণসমাবেশস্থল লালদিঘির মায়দান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে জনস্রোত ছড়িয়ে পড়ে কোতয়ালি থানার মোড় থেকে আন্দরকিল্লা, সিনেমা প্যালেস পর্যন্ত সড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে।

সনাতনীরা মিছিল সহকারে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত করেন -আমার মাটি আমার মা,এদেশ ছেড়ে যাব না, ‘একদফা একদাবি ৮ দফা মানতে হবে’, ‘প্রশাসন নীরব কেন? জবাব চাই দিতে হবে’, ‘আমার মায়ের কান্না… বৃথা যেতে দিব না’, ‘আমার দেশ সবার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ‘রক্তে আগুন লেগেছে, সনাতনীরা জেগেছে’, ‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই লড়াই করে বাঁচতে চাই’, জয় শ্রীরাম সহ বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। 

পুন্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস বলেন, ‘যেই মঞ্চ থেকে ছয় দফা দাবি ঘোষিত হয়েছে, সেই লালদিঘীর ময়দানে আজ হিন্দু সনাতনদের গণজোয়ার এসেছে‌। আমাদের যত বেশি নির্যাতন করা হবে তত বেশি আমরা এক হবো। এই ঐক্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা থেকে শুরু করে বাংলার কৃষ্টি কালচারের ঐক্য। এই ঐক্য কোনোভাবে খণ্ডিত করা যাবে না। আট দফা দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে ইতোমধ্যে ১৯ সদস্যের সমন্বয়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘৯৩ জন হিন্দুকে পুলিশের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। যারা রাজনীতি করে না, মানবতার কথা বলছে, তাদের মামলার আসামি করা হচ্ছে। সংখ্যানুপাতিক হারে হিন্দুদের সংসদে আসন বিন্যাস করতে হবে। প্রয়োজনে ভোট বর্জন করবো, গণতন্ত্রের নামে প্রহসন চাই না। ১৫ হাজার কোটি টাকা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের মাত্র ২০০ কোটির মতো সংখ্যালঘুদের জন্য কেন?
‘আট দফা দাবি আদায় না করা পর্যন্ত প্রতিটি বিভাগে মহাসমাবেশ হবে, জেলায় জেলায় সমাবেশ হবে। এরপর ঢাকা অভিমুখে লংমার্চ হবে।’

সনাতন জাগরণ মঞ্চের মহাসমাবেশে কৈবল্যধাম আশ্রমের মহারাজ কালীপদ ভট্টাচার্য্য বলেন, সনাতনী সমাবেশ যাতে উজ্জীবিত হয় এজন্য ঐক্যবদ্ধ হন। সনাতনী সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন ৮ দফা দাবি বাস্তবায়ন করতে হবে। মৃত্যু হবেই, ভয় নেই। মৃত্যুকে ভয় করলেই চলবে না, এ মাতৃভূমিতে আমরা উড়ে এসে বসিনি।

শ্রীশ্রী গোপীনাথ দাস ব্রহ্মচারী গুরুমহারাজ বলেন, যে নতুন বাংলাদেশ গঠন করা হল সেখানে প্রশাসনের ব্যবস্থা থাকার পরও কেন ষষ্ঠী পূজার দিন প্রতিমা ভাঙা হল? বিসর্জনে কেন ঢিল ছোঁড়া হল। এসবের জবাব দিতে হবে। সনাতনীরা বাঙলাতে জন্মেছে, এখান থেকে বিতাড়িত করার দুঃসাহস কারও নেই। সনাতনী ধর্ম সম্পর্কে কেউ যদি বিদ্রুপ আলোচনা করে তাহলে কোনো সনাতনী বসে থাকবে না। আমরা কোনো রাজনৈতিক নেতার পা ধরে বাঁচি না। ধর্মান্তরিত করার জন্য একটি চক্র উঠে পড়ে লেগেছে। চোখ কান খোলা রাখতে হবে। নিজেদের ধর্ম রক্ষার জন্য সকলকে সচেতন থাকতে হবে। দাবি না রাজপথে থাকব। দাবি আদায় না হলে নবজাতক নিয়েও রাজপথে নামব আমরা আমাদের ধর্ম রক্ষার জন্য।
এ সময় অন্য বক্তারা বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৩ বছরে সনাতনীরা শুধু অবহেলিত ছিল। সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু সনাতনীদের ভাগ্য বদলায় না। যেই সরকার ক্ষমতায় থাকে তারা সনাতনীদের দুঃখ-দুর্দশাকে লুকানোর চেষ্টা করে। সনাতনীদের সঙ্গে হওয়া অন্যায়, নির্যাতন লুকিয়ে স্বাভাবিকতার কথা বলে। গত ৫৩ বছরে এ দেশে হওয়া হিন্দু নির্যাতন, হত্যার কোনও বিচার হয়নি। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা বারবার এই ধরনের ঘটনা ঘটাতে উৎসাহিত হয়েছে। প্রতিবার ভোট পরবর্তী বা ক্ষমতার পালাবদলের সময় নির্যাতনের খরগ নেমে আসে হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরের উপর,প্রতিমা ভাংচুর,মা-বোন ও সনাতনীদের বাড়ীঘর এর উপর।

সনাতনী সম্প্রদায়ের আট দফা দাবিগুলো হলো—

১/সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দোষীদের দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত শান্তি প্রদান, ক্ষতিগ্রস্তদের যথাপোযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

২/অনতিবিলম্বে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে।

৩/সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।

৪/হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে হিন্দু ফাউন্ডেশনে উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টিকেও ফাউন্ডেশনে উন্নীত করতে হবে।

৫/দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন আইন’ যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।

৬/প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের জন্য উপাসনালয় নির্মাণ এবং প্রতিটি হোস্টেলে প্রার্থনা রুম বরাদ্দ করতে হবে।

৭/সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড আধুনিকায়ন করতে হবে।

৮/শারদীয় দুর্গাপুজায় ৫ দিন ছুটি দিতে হবে।

সনাতন জাগরণ মঞ্চের মহাসমাবেশ স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস ব্রহ্মচারীর সঞ্চালনায় এই বিশাল মহাসমাবেশে বক্তব্য দেন– শংকর মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ তপনান্দ গিরি মহারাজ, কৈবল্যধাম আশ্রমের মহারাজ কালীপদ ভট্টাচার্য্য,শ্রীশ্রী গোপীনাথ দাশ ব্রহ্মচারী গুরুমহারাজ,পটিয়া পাচোরিয়া তপোবন আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ রবীশ্বরানন্দ পুরী মহারাজ, ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের অধ্যক্ষ লীলারাজ গৌর দাস ব্রহ্মচারী, বাঁশখালী ঋষিধামের মোহন্ত সচিদানন্দ পুরী মহারাজ, শ্রীমৎ মুরারী দাস বাবাজী, তপোবন আশ্রমের অধ্যক্ষ শ্রীমৎ প্রাঞ্জলানন্দ পুরী মহারাজসহ সাংবাদিক, আইনজীবী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চটগ্রামের সনাতনী জাগরণ মঞ্চের এই বিশাল মহাসমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।

October 2026
S S M T W T F
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31