• ২৮শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৩ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৪ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

ঢাকার বনানীর কোল জুড়ে এক টুকরো গ্রামীণ রেস্টুরেন্ট- যাত্রা বিরতি

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত নভেম্বর ৫, ২০২৪
ঢাকার বনানীর কোল জুড়ে এক টুকরো গ্রামীণ রেস্টুরেন্ট- যাত্রা বিরতি

: কে আই তাজ ও রাজীব দে

পাঠক, চিরায়ত বাংলার রন্ধন শিল্পের কথা মনে পড়ে? গ্রামীণ পরিবেশে সত্তর, আশি ও নব্বই দশকে মাটির সানকি, বাসনে বা কলা পাতায় ধোঁয়া উড়া ভাত বেড়ে খাওয়া? সাথে একটু ডাল, লবণ, তরকারি পাতে তুলে নিয়ে পরম তৃপ্তি নিয়ে পেট পুরে খাওয়া। ২০২৪ সালে এসে এমন রূপ দেখতে চান, তাও আবার রাজধানী ঢাকায়? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তবে আপনার জন্য অপেক্ষায় ‘যাত্রা বিরতি’। নান্দনিক ফিউশন ধর্মী বাংলা নিরামিষ খাদ্যের রেস্টুরেন্ট এটি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বসবেন, আর নানান পদের ঐতিহ্যবাহী টাটকা খাবার উপভোগ করবেন, সাথে যুক্ত হবে পরিচ্ছন্ন আদুরে বিড়াল এবং কুকুরের মায়াবী ও অহিংস খুনসুটি। মাঝে মাঝে কবুতর বাকবাকুম করে উঠবে, প্রজাপতি, ঘাস ফড়িং আপনাকে কিঞ্চিৎ অভ্যর্থনা জানাবে। নীচ তলার কর্নার এবং খোলা প্রকৃতির মাঝে তৃতীয়- চতুর্থ তলা মিলে ডুপ্লেক্স স্টাইলে আসন পাতা হয়েছে সব খাদ্যপ্রেমীদের জন্য। ১০০ জনের মত একত্রে বসতে পারবে সব মিলে। ছাদে দেখা মেলে খড়ি, কঞ্চি বা বাঁশের নকশা৷ টিস্যুর বদলে কাপড়ের রুমাল সবার নজর কাড়ে। নীচে ঘাসময় একটি ছোট উঠোন রয়েছে, পাশে ফুল গাছ, ফল গাছ। যে আসনে বসবেন, তা কাঠের চেয়ার, বেতের মোড়া, আপসাইক্লিং করা রঙিন কাপড়ে আচ্ছাদিত। মজার ব্যাপার, সব মেন্যুবুক গ্রামীণ চেকের গামছায় মোড়ানো। দেওয়াল জুড়ে কাগজের বাহারী ফুল শোভা পায়। প্লাস্টিকমুক্ত এই রেস্টুরেন্টটি।

এবার খাবারের বিবরণী। মাছ- মাংসের দেখা মিলবে না যাত্রা বিরতিতে। তবে ভেজিটেরিয়ান ঘরানার সব অদ্ভুত সব আইটেমে নিজেকে বাদশাহ বাদশাহ মনে হবে। শর্মা ঘরানার মাশরুম র‍্যাপ, মিক্সড ভেজিটেবল র‍্যাপ, লুচি আলুর দম, ভেজিটেবল বাস্কেট, ডাল পুরি প্ল্যাটার, পুলি-চিতই বা সমুচা বাস্কেট ইত্যাদি দিয়ে হালকা ক্ষুধা বা নাস্তা মেটানো যায়। আছে, চটপটি, ফুচকা এবং মাশরুম হালিম। অতি ক্ষুধার্ত থাকলে ভারী খাবার হিসেবে আছে- সবজি- চাটনি মিশ্রিত খিচুড়ি প্ল্যাটার, স্টিকি রাইস প্ল্যাটার, বাংলার ভাত-ভর্তা-ডাল প্ল্যাটার, পাহাড়ি বিন্নী চালের সুগন্ধী রাইস প্ল্যাটার, ছিটা-রুটি প্লাটার এবং অদ্ভুত ঘরানার মাশরুম তেহারী। বিশেষত, মাশরুম তেহারী খেলে বুঝাই যায় না যে এতে মাংস অনুপস্থিত! দক্ষ রাধুনীর এমন মুন্সীয়ানায় তৈরি হয় এসব মনলোভা আইটেম। খাবার সমূহ পরিবেশনের ঢং চমৎকার, দেখতে নান্দনিক, পরিপাটি এবং খাদ্যমান অত্যন্ত স্বচ্ছ, খেতে সুস্বাদু। ডেজার্ট বা মিষ্টি ঘরানায় রয়েছে- চিজ পালং পুলি, গাজরের হালুয়া, কয়েক পদের অসাধারণ আইসক্রীম, যার মধ্যে নারকেল ও রুহ আফজা আইসক্রীম দুর্দান্ত। তাজা ফলের মোহনীয় জুসের কথা আর নাই বা বলি! জলপাই, কমলা, পেঁপে ও ঋতুভিত্তিক ফলের সতেজ জুস মনকে হিমশীতল সন্তুষ্ট করে দেয়।

দাম যে সস্তা তা বলা যাবে না। তবে আনুষঙ্গিক পরিবেশ, অবস্থান, খাদ্যমান, গুণগতমান এবং অন্যান্য নামকরা ক্যাফে বা রেস্টুরেন্ট বিবেচনায় খাবারের দাম হাতের নাগালে। এমনটাই জানালেন যাত্রা বিরতির জেনারেল ম্যানেজার মৃন্ময়ী দাস। তিনি আমাদের টিমকে আরও বলেন- “যাত্রা মূলত ভালবাসার সুতোয় বাঁধা একটি বড় গৃহ বা পরিবারের মত। এক শব্দে আমরা বলি যাত্রা পরিবার। বাংলা ব্যান্ডের প্রখ্যাত ভোকালিস্ট আনুশেহ আনাদিল ২০০০ সালে এই যাত্রা বিরতি এবং যাত্রা পরিবারের শুভ সূচনা করেন। আমরা পরম মমতার ছোঁয়া এবং যত্নে সব খাবার প্রস্তুত এবং পরিবেশন করি, তাই খাদ্যপ্রেমীদের কাছে যাত্রা বিরতির গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশী। খাবারের অর্ডার দিয়ে ২০/৩০ মিনিট অপেক্ষা করতে হয়, কেননা অর্ডারের এরপরেই তৈরি করে উষ্ণ পরিবেশন করা হয়। রেস্টুরেন্টের পরিবেশ একদম নিরিবিলি, নিভৃতচার, হৈচৈ মুক্ত, মায়া- মমতায় মাখা। মিডিয়া জগতের (সিনেমা, নাটক, সংগীত) অনেক সেলিব্রেটি এবং অজস্র বিদেশী পর্যটক এই রেস্টুরেন্টে নিয়মিত খাবার খেতে আসেন। সকাল ১১ টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে রেস্টুরেন্টটি।” স্থাপত্যে পড়াশোনার সাথে যাত্রা বিরতিতে কাজ করার সংযোগ কেন, উত্তরে মৃন্ময়ী বলেন- “স্থাপত্য মানেই মানুষের কাছে থাকা। মানুষকে বোঝা। আর যাত্রার চেয়ে সুন্দর উপায়ে মানুষ তথা সকল প্রাণকে বোঝার সুযোগ আর কোথায় পেতাম? তাই যাত্রা পরিবারে সংমিশ্রণ।” উল্লেখ্য, যাত্রা আঙিনায় যে সব আল্পনা নজর কাড়ে, সিংহভাগই গুণী মৃন্ময়ীর তুলির আঁচড়। তার হাতের আদরে যাত্রার মাটিতে আল্পনার দল খেলা করে, আর আমন্ত্রণ জানায় সকলকে। যে আল্পনায় প্রতিদিন হাজারো মানুষের পদচিহ্নেই মৃন্ময়ী খুঁজে পান কাজের স্বার্থকতা। রেস্টুরেন্টের পার্শ অবয়ব তাই সমুজ্জল।

উল্লেখ্য, রেস্টুরেন্ট ছাড়াও এ আঙিনায় হ্যান্ডিক্রাফটস, লাইফ স্টাইল পণ্য, শো-পিস ক্রয় করার জন্য যাত্রা শো-রুম রয়েছে। যেখানে বাংলার চিরায়ত নকশা, রিকশা-পেইন্ট সহ বিভিন্ন নকশা শৈলীর আদলে হাজারো জিনিস কিনতে পাওয়া যায়। খাদ্যপ্রেমীরা খাওয়া-দাওয়ার আগে পরে এখানেও ঢুঁ মারেন, পছন্দের জিনিস কিনে থাকেন। এই শো-রুমের দায়িত্বে রয়েছেন রাজিবুল হক পিয়াস। প্রচারের পাশাপাশি শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষকতা করা যাত্রা ও যাত্রা বিরতির অন্যতম প্রয়াস। ফলশ্রুতিতে, যাত্রা তার গ্যালারী আয়তনকে উন্মুক্ত করেছে বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীদের শিল্প পরিবেশনের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে। যাত্রা গ্যালারি হয়ে উঠেছে বাংলার আদি সংস্কৃতি, চিরায়ত পরিবেশনা ও শিল্পকলার সুন্দর অভয়ারণ্য। যাত্রা ও যাত্রা বিরতির ঠিকানা- ৬৩, রোড ১৭/এ, ব্লক-ই, বনানী, ঢাকা।