• ৩১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৬ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৭ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

খেলনা শিল্পের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান ঢাকা চেম্বারের

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৫
খেলনা শিল্পের রপ্তানি বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান ঢাকা চেম্বারের

ডিসিসিআইতে “রপ্তানি বহুমুখীকরণ; খেলনা উৎপাদন শিল্পে উদ্ভাবন

এবং রপ্তানির সম্ভাবনা” শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

বর্তমানে বৈশ্বিক খেলা শিল্পের বাজার ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ মাত্র ৭৭ মিলিয়ন। প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার অভাব, কাঁচামাল আমদানিতে উচ্চ শুল্ক হার, বন্ডেড সুবিধার অনুপস্থিতি, অপ্রতুল অবকাঠামো, টেস্টিং সুবিধার অপর্যাপ্ততা প্রভৃতির কারণে এ শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে মত প্রকাশ করেন ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ, সেই সাথে উদ্ভাবনী কার্যক্রমে শিক্ষাখাতের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি এবং সরকারী সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়ানোর উপর তিনি জোরারোপ করেন। উল্লেখ্য, অদ্য ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত “রপ্তানি বহুমুখীকরণ; খেলনা উৎপাদন শিল্পে উদ্ভাবন এবং রপ্তানির সম্ভাবনা” শীর্ষক ফোকাস গ্রুপ আলোচনা সভায় তিনি এ অভিমত জ্ঞাপন করেন।

ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সদস্য (কাস্টমস : নীতি ও আইটি) মুহাম্মদ মুবিনুল কবীর এবং বাংলাদেশস্থ বৃটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডওসন বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদান করেন।

অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণের বিষয়টি বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিগত বছরগুলোতে আমাদের রপ্তানি গুটিকয়েক পণ্যের উপর অধিকমাত্রায় নির্ভরশীল। ডিসিসিআই সভাপতি জানান, খেলানা সামগ্রী রপ্তানির বৈশ্বিক বাজার ১০২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যেটি ২০২৩০ সালে ১৫০ বিলিয়নে পৌঁছাবে, সেখানে এখাতে আমাদের রপ্তানি মাত্র ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের অনুপস্থিতি, টেস্টিং সুবিধার অপ্রতুলতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতা, ব্যবহৃত কার্চামালে আমদানি নির্ভরতা ও আমদানি পণ্যের উপর উচ্চ শুল্কারোপ, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সহায়ক নীতিমালার অভাবে এখাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না, বলে মত পোষন করেন তাসকীন আহমেদ।

এনবিআারের সদস্য মুহাম্মদ মুবিনুল কবীর বলেন, এলডিসি পরবর্তী সময়ে তৈরি পোষাকের পাশাপাশি সম্ভাবনাময় অন্যান্য খাতের উপর নজর দিতে হবে, এলক্ষ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সংশ্লিষ্ট নীতিমালা সহজীকরণ ও বন্ডেড সুবিধা প্রদানে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে প্রণীত ট্যারিফ নীতিমালার অনুসারে রাজস্ব বিভাগ শুল্ক আরোপ করে থাকে এবং এক্ষেত্রে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর কিছু সুপারিশ থাকে, যা মেনে চলতে হয়। অর্থবছরের মাঝামাঝি সময়ে কোন নীতি সহায়তা পরিবর্তনের তেমন সুযোগ নেই, তবে আগামী বছরে বাজেট প্রণয়নে এখাতের প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা প্রদানের বিষয়টি সরকারের বিবেচনার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। এনবিআর সদস্য আরো বলেন, গত ৪০ বছর ধরে তৈরি পোষাকখাতে সহায়তা দেওয়া হলেও এখাতের সক্ষমতা কতটুকু বেড়েছে তা নিয়ে চিন্তার সময় এসেছে, তাই খেলনা শিল্পের উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা প্রাপ্তির চাইতে নিজেদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো এবং পণ্যের উদ্ভাবনী কার্যক্রমে বেশি হারে মনোযোগী হওয়ার উপর তিনি জোরারোপ করেন।

বৃটিশ হাইকমিশনের ডেপুটি ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর মার্টিন ডওসন বলেন, বাংলাদেশে উৎপাদিত খেলনা পণ্য রপ্তানির প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে এবং বৃটিশ সরকার এখাতে সহযোগিতা করতে বেশ আগ্রহী। বিদ্যমান নীতিমালার সংষ্কার ও প্রতিবন্ধকতা নিরসন করা সম্ভব হলে বৃটেনে এখাতের পণ্যের রপ্তানি আরো বহুগুন বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, বৃটিশ সরকার সম্প্রতি রুলস অব অরিজিনের শর্তাবলী সহজীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা বাংলাদেশী উদ্যোক্তাদের তাঁর দেশে পণ্য রপ্তানি সম্প্রসারণে সহযোগিতা করবে। তিনি উল্লেখ করেন, এনবিআর শিল্পখাতের কাঁচামালের কাস্টম্স ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ সহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা নিরসন করেছে, যা বাংলাদেশের সামিগ্রক রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্লাস্টিক গুডস ম্যানুফেকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোটার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এবং জালালাবাদ পলিমারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, প্লাস্টিক খাতে বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজারের মত প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ২৫০টি খেলনা সামগ্রী উৎপাদনের সাথে জড়িত এবং এখাতে প্রায় ১.৫ মিলিয়ন মানুষ কর্মরত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এখাতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং দেশের আভ্যন্তরীণ বাজারের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। তিনি জানান, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে খেলান সামগ্রী রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৫.২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮৮টি দেশে রপ্তানির মাধ্যমে তা ৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে পণ্যের মান নিশ্চিতকরণ, অপ্রতুল অবকাঠমো, গবেষণা কার্যক্রমের অনুপস্থিতি এবং নতুন পণ্যের ডিজাইন উদ্ভাবনে পিছিয়ে থাকা প্রভৃতি বিষয়সমূহের কারণে এখাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে শামীম আহমেদ অভিমত প্রকাশ করেন। সেই সাথে এখাতের সার্বিক উন্নয়নে ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট, পণ্য উদ্ভাবন কাজে মানব সম্পদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ প্রদান, জয়েন্ট ভেঞ্চার বিনিয়োগকে উৎসাহিত করণ, অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন, প্লাস্টিক খাতের উন্নয়ন নীতিমালার মধ্যেই খেলনা সামগ্রী শিল্পের নীতিমালা প্রণয়ন, পণ্য উৎপাদনে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির উপর সম্পূরক শুল্ক হ্রাস প্রভৃতির উপর তিনি জোরারোপ করেন।

এছাড়াও অনুষ্ঠানটির নির্ধারিত আলোচনায় শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের পরিচালক ড. অশোক কুমার রয়, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের জয়েন্ট চীফ (ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেট ডিভিশন) মোঃ মামুন-উর রশিদ আসকারী, গোল্ডেন সন লিঃ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেলাল আহেমদ, কাপকেক এক্সপোটার্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াসির ওবায়েদ, প্রেমিয়াফ্লেক্স প্লাস্টিকস লিমিটেডের ডেপুটি এক্সিকিউটি ডিরেক্টর মোঃ আনিসুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (বর্জ্য এবং কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা) ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, আমান প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি’র প্রোপাইটর আমান উল্ল্যাহ, হ্যাসি টাইগার কোম্পানী লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মুসা বিন তারেক এবং রেডমিন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা মোঃ জহিরুল হক অংশগ্রহণ করেন।

আলোচনায় অংশ নিয়ে মোঃ জহিরুল হক বলেন, এখাতের পণ্য উদ্ভাবন এবং ডিজাইনে নতুনত্ব আনায়ন জরুরী। মুসা বিন তারেক জানান, উচ্চ শুল্কহারের কারণে প্লাস্টিক কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় বাড়ার কারণে ফলে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সরকার প্লাস্টিক খাতের সবুজ ও হলুদ ক্যাটাগরীতে শিল্পের নবায়ন যথাক্রমে ৫ ও ২ বছরের মওকুফ করেছে, যা ব্যবসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ করবে পাশাপাশি এখাতে গবেষণার জন্য শিক্ষাখাতকে সম্পৃক্ত করা এবং জ্বালানী, পানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। মোঃ আনিসুর রহমান এখাতের সংশ্লিষ্ট শুল্ক ও পলিসির সঠিক বাস্তবায়নের পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হার হ্রাসের উপর জোরারোপ করেন। ওয়াসির ওবায়েদ বলেন, এখতের সাপ্লাইচেইন শক্তিশালীকরণ, নীতিমালার সুসংহতকরণ, পণ্যের মেধাস্বত্ত্ব এবং সরকারী সংস্থাগুলোর মধ্যকার সমন্বয় বাড়ানোর আহ্বান জানান। বেলাল আহেমদ বলেন, প্লাস্টিক ভিত্তিক খেলনা শিল্পের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকার কারণে উদ্যোক্তারা সরকারী সহায়তা হতে বঞ্চিত হচেছ, যার করণে রপ্তানি ব্যাহত হচেছ। মোঃ মামুন-উর রশিদ আসকারী বলেন, সিঙ্গেল ইউন্ডো ব্যবহারের জন্য ব্যবসায়ীদের আহ্বান যার মাধ্যমে পণ্য আমদানি প্রক্রিয়া সহজতর হবে এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষনে পণ্যের মেধাস্বত্ত্ব নিশ্চিতের মনোযোগী হতে হবে। ড. অশোক কুমার রায় বলেন, এলডিসি উত্তরণের পর ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের পণ্যের নকশা নকল না করে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কের ধারণার সাথে মানিয়ে নিতে হবে।

ডিসিসিআই ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ চৌধুরী, সহ-সভাপতি মোঃ সালিম সোলায়মান এবং পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ সংশ্লিষ্ট খাতের প্রতিনিধিবৃন্দ এ সময় উপস্থিত ছিলেন।