বাংলাদেশের অর্থনীতির গতিধারা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি দ্রুত মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (PMI) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারে। ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আয়োজিত “বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও ব্যবসায়িক আস্থা পর্যবেক্ষণে PMI” শীর্ষক সেমিনারের উপস্থাপনায় এসব তথ্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়।
PMI হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি পরিমাপের একটি স্বীকৃত সূচক। এটি নতুন অর্ডার, উৎপাদন, কর্মসংস্থান, ইনপুট মূল্য, সরবরাহব্যবস্থা, মজুদ পণ্য, অসম্পূর্ণ অর্ডার এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনাসহ সামগ্রিক গতিপ্রকৃতির পরিবর্তন তুলে ধরে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো আগের মাসের তুলনায় পরিস্থিতি উন্নত, অপরিবর্তিত নাকি অবনত হয়েছে তা নিশ্চিত করে।
সাধারণভাবে PMI-এর মান ৫০-এর বেশি হলে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ এবং ৫০-এর নিচে হলে সংকোচন নির্দেশ করে। এই সূচকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি সরকারি পরিসংখানি তথ্য প্রকাশের আগেই দ্রুত প্রকাশিত হয়, যা অর্থনীতির গতিপথের আগাম সংকেত প্রদান করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, গবেষক ও বিনিয়োগকারীরা অর্থনীতির বাস্তব অবস্থা বুঝতে এ জাতীয় তথ্য ব্যবহার করতে পারেন।
বাংলাদেশের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনীতিতে সরকারি জিডিপি, শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের তথ্য প্রকাশিত হতে কিছুটা সময় লাগে। PMI দ্রুত প্রকাশিত হওয়ায় অর্থনীতির বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সময়োপযোগী ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়। এর মাধ্যমে নতুন অর্ডার বৃদ্ধি, উৎপাদনের গতি, কর্মসংস্থানের প্রবণতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ এবং মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সংক্রান্ত পূর্বাভাস পাওয়া যায়। ফলে নীতিনির্ধারকরা দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ পান। একইভাবে ব্যবসায়িক সম্প্রসারণের ইঙ্গিত পেলে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা সহজ হয়। এ কারণেই PMI-কে অর্থনীতির একটি কার্যকরী ‘আর্লি-ওয়ার্নিং’ বা আগাম সংকেতসূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে PMI-এর প্রতিফলন:
বাংলাদেশে PMI গত কয়েক বছরে অর্থনীতির বিভিন্ন ধরনের ধাক্কা ও পরিবর্তনের নিখুঁত প্রতিফলন দেখিয়েছে:
জুলাই ২০২৪: দেশব্যাপী আন্দোলন, কারফিউ এবং ১০ দিনের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে PMI জুনের তুলনায় ২৭ পয়েন্ট কমে ৩৬.৯-এ নেমে আসে।
মার্চ–এপ্রিল ২০২৫: দীর্ঘ সরকারি ছুটি, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক সংক্রান্ত চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতার প্রভাবে PMI সূচক ৮.৮ পয়েন্ট হ্রাস পায়।
অক্টোবর–নভেম্বর ২০২৫: বৈশ্বিক চাহিদা হ্রাস, রফতানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিনিয়োগ স্থগিত রাখার কারণে সূচক আরও ৭.৮ পয়েন্ট কমে।
মে–জুন ২০২৬: দীর্ঘ ঈদের ছুটি, বর্ষার শুরু, ঈদের আগের চাহিদা কমে যাওয়া এবং নতুন ১৫ শতাংশ ভ্যাটের প্রভাবে PMI আরও ৯.৯ পয়েন্ট কমে ৫২.৯-এ দাঁড়ায়।
জরিপের কাঠামো ও আন্তর্জাতিক ব্যবহার:
বাংলাদেশে PMI প্রস্তুত করতে প্রতি মাসে কৃষি, উৎপাদন, নির্মাণ ও সেবা খাতের মোট ৪০০টি প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে কৃষি খাতে ৪৬টি, উৎপাদনে ৯২টি, নির্মাণে ৫০টি এবং সেবা খাতে ২১২টি প্রতিষ্ঠান। নিয়মিত এ জরিপের মাধ্যমে ব্যবসার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা—উভয় ধরনের তথ্যই সংগৃহীত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোজোন, চীন, ভারত ও জাপানসহ বিশ্বের প্রধান প্রধান অর্থনীতিগুলো নিয়মিত PMI প্রকাশ ও ব্যবহার করে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, PMI-এর সাথে বাস্তব GDP প্রবৃদ্ধির শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোজোনের ক্ষেত্রে PMI ও সর্বশেষ GDP অনুমানের মধ্যে ৮২% এবং মহামারির আগের সময়ে ত্রৈমাসিক PMI ও প্রথম GDP অনুমানের মধ্যে ৮৩% পর্যন্ত মিল পাওয়া গেছে।
PMI শুধু সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্রই তুলে ধরে না, বরং নির্দিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও সহায়ক ভূমিকা রাখে। সরবরাহকারী নির্বাচন, দর কষাকষি, উৎপাদন পরিকল্পনা, বিনিয়োগের ঝুঁকি বিশ্লেষণ, শেয়ার ও বন্ড বাজার, বৈদেশিক মুদ্রা এবং আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এটি সরাসরি ব্যবহারযোগ্য।
সেমিনারে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক তথ্যের প্রাপ্যতা, সময়ানুবর্তিতা ও বিশদ বিশ্লেষণ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি পোশাক (RMG), ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) এবং সেবা খাতের জন্য পৃথক খাতভিত্তিক PMI তথ্য তৈরির সুপারিশ করা হয়। সার্বিকভাবে, PMI-এর পরিধি ও মান আরও উন্নত করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পূর্বাভাস এবং প্রমাণভিত্তিক নীতি নির্ধারণের সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।