• ৫ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২০শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৫শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি বাতিল ও সকল ক্যাডারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে নতুন কমিটি গঠনের দাবিতে

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ৫, ২০২৪
গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি বাতিল ও সকল ক্যাডারের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে নতুন কমিটি গঠনের দাবিতে

বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ, আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের সদস্যবৃন্দ, সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়কবৃন্দ ও সম্মানিত সুধী, আসসালামু আলাইকুম।

হাজার শহিদের রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার উৎপাটন ঘটিয়ে আজকে এখানে আমাদের মতপ্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। বীর শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আহত সদস্যদের গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।

আপনারা অবগত আছেন যে, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন, সংবিধান ও দুর্নীতি দমন বিষয়ে সংস্কারের জন্য ছয়টি কমিশন গঠনের কথা জানান। এ প্রসঙ্গে ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ তারিখে প্রেস ব্রিফিংয়ে আইন উপদেষ্টা জনাব আসিফ নজরুল ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার কথা উল্লেখ করে বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেটা ছিল একটা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন এবং প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন। বাংলাদেশে যেন আর কোনোদিন, কখনও যেনো ফ্যাসিবাদী শাসন জাঁকিয়ে বসতে না পারে, সেটা রোধ করতে কী কী সংস্কার প্রয়োজন সে লক্ষ্য নিয়ে সংস্কার কমিশন কাজ করবে বলে তিনি জানান। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের পরামর্শ সংস্কার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সংস্কার কমিশনের কর্মপদ্ধতির বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজুল আলম বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ঠ ছিল। এখন জনগণের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়টি যেমন আছে, তেমনি গত ১৫ বছরে দেশের সকল প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো জনগণের স্বার্থে কাজ করতে পারছে না। এগুলোকে ঢেলে সাজাতে হবে।

আপনারা জানেন যে, জনবান্ধব রাষ্ট্র গঠনে ক্যাডার বৈষম্য নিরসনের লক্ষ্যে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ৩১ আগস্ট ২০২৪ তারিখে আপনাদের মাধ্যমে জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য আমাদের বক্তব্য উপস্থাপন করেছিলাম। পরবর্তীতে সকল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টাদের সাথে সাক্ষাৎকারের জন্য আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ লিখিত আবেদন জানায়। ইতোমধ্যে পাঁচজন সম্মানিত উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠিত হয়। কেমন জনপ্রশাসন হওয়া উচিত- দীর্ঘদিন সিভিল প্রশাসনের বিভিন্ন সেক্টরে কাজের অভিজ্ঞতায় আমরা উপদেষ্টামণ্ডলীর সামনে লিখিতভাবে উপস্থাপন করি এবং সকলেই আমাদের দাবিকে যৌক্তিক বলে মতামত প্রদান করেন। বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে ইতোপূর্বে জনপ্রশাসন সংস্কারের জন্য যেসব কমিটি গঠন করা হয়েছিলো, সেগুলো তাঁদের দিয়েই করা হয়েছিলো, যারা নিজেদের সুবিধার্থে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি করেছেন। অতীত অভিজ্ঞতা এবং অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে আমরা সকলকে অবগত করেছিলাম যে, এবারও তেমন কমিটি গঠন হতে পারে। বিষয়টি খেয়াল রেখে সকল পেশার সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি গঠনের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট সকলকে অনুরোধ করি। সেই সাথে সকল পেশার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে ২৫টি ক্যাডারের সদস্যদের সংগঠন ‘আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ’-কে অন্তর্ভুক্ত করে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি করতে সকল উপদেষ্টাকে লিখিতভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। সাক্ষাতে বিষয়টি উপস্থাপন করলে উপদেষ্টামণ্ডলী আমাদেরকে আশ্বস্তও করেছিলেন। আমরাও আশা করেছিলাম, প্রকৃত জনসেবা ব্যবস্থাপনায় প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারীর মতামতের ভিত্তিতে এবার একটি আধুনিক জনসেবা ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার সুযোগ হবে।

কিন্তু গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করলাম ‘জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন’ যে আট সদস্যের

কমিটি গঠন করেছে, সেখানে ২৫টি ক্যাডারের কোনও সদস্য নেই। বরং কমিশন প্রধানসহ ছয়জন সদস্য একটি ক্যাডারের, যারা সিভিল প্রশাসনের বৈষম্য সৃষ্টিকারী। এছাড়া ইতোপূর্বেও বৈষম্য নিরসনে তাঁদেরকে দিয়েই কমিটি গঠিত হয়েছিলো, এবং তাঁরা সেই সুযোগে বৈষম্য আরও বৃদ্ধি করেছেন।

বিগত ১৫ বছরে যারা জনপ্রশাসনে থেকে ভোটারবিহীন নির্বাচনে সহযোগিতা করেছেন, যারা এদেশের জনসেবা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছেন নিজস্ব স্বার্থে, যারা প্রশাসন ব্যবস্থাকে চরম কেন্দ্রীভূত করে সকল ক্ষমতা নিজেদের হাতে কুক্ষিগত করেছেন, তাদেরকেই কমিশনের সদস্য করা হয়েছে; যেনো এদেশের উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য ব্যতীত আর কারো কোনো ভূমিকা নেই। এ কারণেই স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে জনসেবা ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। বস্তুত বাংলাদেশের প্রশাসন ব্যবস্থায় পেশাদারত্বের কোন মূল্য দেওয়া হয়নি, এখনও হচ্ছে না। একটি ক্যাডার যাদের প্রকৃত কাজ ছিল ভূমি ব্যবস্থাপনা, কালের প্রবাহে চানক্য-নীতি অবলম্বন করে, আজ তারা পুরো প্রশাসন ব্যবস্থা গিলে ফেলেছেন। নিজেদের মূল দায়িত্ব ফেলে আজ তাঁরা সকল ক্যাডারের মধ্যে কর্তৃত্ববাদের নীতি গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার দুর্গতি সম্পর্কে আমরা সবাই কমবেশি অবগত আছি।

যদিও কমিশন গঠনের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সরকার জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অনুমোদনক্রমে ‘জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন’ নামে এ কমিশন গঠন করল। কিন্তু ‘আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ’ মনে করে, বৈষম্যপূর্ণ এ কমিশন কোনোভাবেই বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারবে না বরং বিদ্যমান সিভিল প্রশাসন আরও গণবিরোধী হবে। তাই, পরিষদ এ কমিশনকে প্রত্যাখ্যান করছে এবং সকল পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তি করে পুনর্গঠন করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে।

এভাবে জনমুখী সেবা ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। জনপ্রশাসন শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে

আছে মানুষকে শাসন, শোষণ ও নির্যাতনের বীজ। তাই আমরা আধুনিক বাংলাদেশের সেবা

ব্যবস্থাপনা থেকে ‘জনপ্রশাসন’ শব্দটিই বাতিল করতে চাই। জনগণের টাকার বেতনভুক্ত

ব্যক্তি কোনভাবেই জনগণের প্রশাসক হতে পারেন না। তাই জনপ্রশাসন শব্দটি যথাযথ নয়।

সময় এসেছে এসব চিন্তা করার এবং ভ্রান্তনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার। কিন্তু এসব চিন্তা

যেন করা না যায়, জনসেবার প্রকৃত রূপরেখা যেন প্রকাশ না পায়, সে জন্য একটা স্বার্থান্বেষী

মহল বাংলাদেশে সব সময় ক্রীড়ানকের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ দেশের ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে ২৫টি ক্যাডারের প্রতিনিধিত্ব করে। প্রায় ৬০ হাজার কর্মকর্তার মধ্যে ২৫টি ক্যাডারে প্রায় ৫৩ হাজার কর্মকর্তা চাকরি করেন। দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি, জনসেবা এ ২৫টি ক্যাডারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাই ২৫টি ক্যাডারকে পাশ কাটিয়ে শুধু একটি ক্যাডারের প্রতিনিধি দিয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার সম্ভব নয়। তাই আমরা প্রস্তাব করছি-

১. বিদ্যমান জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি পুনর্গঠন করতে হবে।

২. আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের মাধ্যমে সকল ক্যাডারের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৩. সিভিল সার্ভিসের বাইরে জনপ্রশাসন বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞকে কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করতে হবে।

আমরা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসী ও সরকারের কাছে এ দাবি ও প্রস্তাব তুলে ধরছি। আমরা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। আমরা রাজপথে নামতে চাই না। কিন্তু সরকারকে বুঝতে হবে আমরা দেশের মোট ৯০-৯২ ভাগ ক্যাডার কর্মকর্তার প্রতিনিধিত্ব করি। তাই আমাদের উপেক্ষা করা হলে পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতির জন্য জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণ দায়ী থাকবেন, যা সরকারের জন্য স্বস্তিকর হবে না।

আপনারা কষ্ট করে আমাদের সময় দেয়ার জন্য আপনাদের অশেষ ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। আশা করছি, আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসী ও সরকার আমাদের দাবি ও প্রস্তাব জানতে পারবেন। জনগণের জন্য জনগণের রাষ্ট্রকাঠামো গঠনে সবাই যার যার অবস্থান হতে সহযোগিতা করবেন।

আমাদের কথা ধৈর্য ধরে শোনার জন্য আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদ

November 2026
S S M T W T F
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930