• ৬ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২১শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৬শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

জীবনের গল্পটা এমন হওয়ার কথা তো ছিল না…!

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত অক্টোবর ২৭, ২০২৪
জীবনের গল্পটা এমন হওয়ার কথা তো ছিল না…!

আমি দীপিকা চক্রবর্ত্তী। পিএ ৪০৯৪০। কথা ছিলো আর মাত্র ১০ দিন পর স্বপ্নের নীল পোশাক গায়ে জড়িয়ে শোল্ডারে র‍্যাংক ব্যাজ, লেনিয়ার আর বুকে পুলিশের নেমপ্লেট লাগিয়ে সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবো। যে স্বপ্ন আমি লালায়িত করেছি দীর্ঘ বছর, যে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কণ্টকাকীর্ন পথে হেটেঁছি বিগত ২৬ বছর এবং লাস্ট ১ বছর ব্যয় করেছি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা প্রমান করার জন্য আর সব কিছুকে অতিক্রম করে সারদার মাঠে নিজেকে শীতের সময় ঠান্ডায় বরফের ন্যায় জমিয়েছি, বৃষ্টিতে ভিজিয়েছি, গ্রীষ্মের ৪২/৪৫° তাপমাত্রার রোদে নিজেকে আরো ১ বছর পুড়িয়েছি। গায়ে ১০৩° জ্বর নিয়ে মাঠের প্রতি বেলার দৌড় শেষ করেছি তবুও মেডিকেল ভর্তি হই নি, মাঠ ছাড়ি নি। নরম হাতের তালুতে কড়া শক্ত চামড়ায় পরিনত হয়েছে ট্রেনিং এর কঠোরতায়। আর রাইফেল কাঁধে নিতে নিতে রাইফেল শরীরের একটা অংশ বলেই যেখানে মনে হতো, এক দিনের জন্য যেখানে মাঠ ছেড়ে কোন প্রকার ছুটি কাটাই নি বরং যখন যেই কাজে ডাকা হয়েছে আপ্রাণ চেষ্টা করে সফলতা দেখিয়েছি প্রতি কাজেই। মাঠ, মঞ্চ কোন কিছুতেই কখনও পিছনে যাই নি। কখনো পড়ে গেলেও সাথে সাথে সব ব্যাথা ভুলে উঠে দাড়িয়েছি। কোন কষ্ট কোন ব্যাথা আমার স্বপ্ন পূরনের বাধা হতে পারে নি। আর ঠিক যখন চুড়ান্ত ভাবে প্রস্তুত করে যখন দেশের সেবায় নিয়োজিত হবো ঠিক তখন এতো দিনের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্ন বানিয়ে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো অব্যাহতি পত্র। অভিযোগ দেওয়া হলো শৃঙ্খলা ভঙ্গের! ব্যাস!

২৬ বছরের স্বপ্নকে ২৬ সেকেন্ডে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হলো। সংবাদটা যখন পাই তখন আমি পি.এল ছুটিতে সেই মুহুর্তে মনে হচ্ছিলো সংবাদটা সত্যি তো!! আমার সেন্স সঠিক কাজ করছে তো? আমার হৃদক্রিয়া ঠিকঠাক কাজ করছে তো? এটা কি দুঃস্বপ্ন! কিন্তু না এটাই ছিলো সত্য এবং নিষ্ঠুর সত্য!

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অব্যাহতি পাওয়া ২৫২ জন সাব-ইন্সপেক্টের লিস্টের আমিও একজন। কথা হলো প্রাইমারি, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেজুয়েশন,পোস্ট-গ্রেজুয়েশন কমপ্লিট করেছি। এই দীর্ঘ শিক্ষাজীবনের টার্ন করার ক্ষেত্রে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগন ও আমার সহপার্টিরা এবং আমার এলাকার মানুষ বলতে পারবে আমার আচরণগত দিক দিয়ে আমি কেমন? গত বছর ৪০ তম এস আই এ নিয়োগ প্রাপ্ত হই। এস আই এ যোগদান করতে সারদার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাই।

কিন্তু এখন ২৫২ জনের লিস্টে আমিও বাদ পড়ি। সাথে আমার সাজানো স্বপ্ন নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেলো। স্তম্বিত হয়ে গেলাম আমি নিজেও। পরিবারের প্রতিটা মানুষ নিস্তব্দ! বাবা, মায়ের চোখের জল, বো‌ন এবং আমা‌দের শুভাকাংখী‌দের কান্না, আমার জীবনের এই করুন পরিনিতি এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দায় আমি কাকে দিবো? এটা কি আমার ভাগ্য নাকি অন্যায় ভাবে আমার জীবনের স্বপ্ন গুলা মুছে দেওয়া হচ্ছে? ব্যাপারটা আমি না নিজে মানতে পারছি, না পরিবারের মানুষ!আমাদের ২৫২ টা পরিবারের অসহায়ত্বের বেদনা কি কেউ বুঝবে? এ কেমন বৈষম্যের স্বীকার হলাম? আমরা কি এর সুবিচার পাবো? রাষ্ট্র আমাদের সাথে এমন আচরণ কেন করছে? দেশের বর্তনাম নীতি নির্ধারক যারা আছেন তারা এমন একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একবার ও কি ভেবেছে এতো দিন পরে এসে অব্যাহতি দিলে এতো গুলি পরিবারের কি বেহাল দশা হতে পারে? যদিও আনিত অভিযোগটি সত্য নয়,কতৃপক্ষ চাইলে সুষ্ঠু তদন্ত করতে পারতো। এখানে অনেকেই আছে যাদের আর্থিক অবস্থা খুব ই শোচনীয় এবং অনেকে জব ছেড়ে গিয়েছিল স্বপ্ন পুরনের জন্য, অনেকের চাকুরির বয়স শেষ। আসলে আমি কারে দোষ দিবো সব দোষ হয়তো আমার ভাগ্যের। ট্রেনিং চলা কালীন সময়ে কতটা কষ্ট করে সব কিছু সামাল দিয়েছি এক মাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ জানে না। যারা সারদায় ট্রেনিং করেছে তারাই ফিল করতে পারবে সেখানে কতটা শারিরীক, মানসিক পরিশ্রম করতে হয়। ভোর ৪ টা হ‌তে শুরু ক‌রে রাত সা‌ড়ে নয়টা পর্যন্ত কি কষ্ট সহ‌্য না কর‌তে হ‌য়ে‌ছে।
বিনা বেতনে ১ বছর ট্রেনিং করেছি। সরকারী খরচে খাওয়া দাওয়া, মাস শেষে ১৮১৫ টাকা পকেট মানি দিতো যেখানে রুমের খালাকে বেতন দিতে হতো ২৫০০ টাকা, সাথে নিজস্ব হাত খরচ সহ আনুষঙ্গিক খরচ তো আছেই। 
আমার মা বাবার আমাকে নিয়ে কত ইচ্ছে কত স্বপ্ন সব এক মূহুর্তে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। মেয়েরা তার বাবা মায়ের খেয়াল রাখতে পারে না এই কথাটাই বদলাতে চেয়েছিলাম আমি। ভাই নেই বলে খোঁচা মারা কথা গুলোকে মিথ্যা করে বাবা মায়ের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলাম। মায়ের অপূর্ন থাকা সব ছোট বড় ইচ্ছা পূরন করবো বলেছিলাম মা’কে। কিন্তু তার আগেই আমার তিলে তিলে লালন করা স্বপ্নের মৃত্যু দেখে ফেললাম আমি।

আমার এতো দিনের সাজানো স্বপ্ন এইভাবে যারা নি:শেষ করে দিয়েছেন তাদের বিচার আমি সৃষ্টি কর্তার উপর ছেড়ে দিলাম। উপরে তিনি সব দেখছেন সব জানেন। জানি আমার এই আকুতি ঈশ্বরের কাছে পৌছাবে না কারন ঈশ্বর থাকেন ভদ্র পল্লীতে উনি আমাদের ডাক শুনবেন না। তবে আমার স্বপ্ন ভঙ্গের দায় কার? এই প্রশ্ন আপনাদের কাছে রেখে গেলাম! এই চাকুরীকে ঘিরেই আমি আমার পরিবারকে নিয়ে স্বপ্ন সাজিয়েছিলাম কিন্তু আপনারা সেটা এক নিমিষেই গুড়ে বালি করে দিয়েছেন।

অনেকে বলছেন আইনি প্রক্রিয়ায় গেলে চাকুরী ফেরত পাবো এক সময়।আরে ভাই যে চাকুরীটা আমার এখন দরকার সেটা পরে পেয়েই আমার কি হবে??যখন আমার মা, বাবা ও প্রিয় মানু‌ষের খু‌শি‌তে কান্না দেখা যা‌বেনা? আর বাংলাদেশের এই আইনি জটিলতা ওভারকাম করার আর্থিক ও মানসিক সক্ষমতা এই মুহুর্তে আমার কোনটাই নেই।
আমার নিজের জীবনকে এই ভাবে অন্ধকার দিকে ঠেলে না দিয়ে এর থেকে ভালো হতো যদি 7.62mm রাইফেল কিংবা LMG বুলেট দিয়ে ব্রাস্ট ফায়ার করে বুকটা ঝাজড়া করে দিতেন। তাইলে হয়ত এতো কষ্ট হতো না। পরিবারের মানুষের অসহায় মুখগুলি দেখতে হতো না।

সব শেষে ঈশ্বরের কাছে একটাই বলা এত তোমাকে ডাকি প্রতিদিন, এত প্রার্থনা আমার, আমার সাথেই কেন এমন করো ঈশ্বর? প্রকৃতি নাকি কখনো কারো ঋন রাখে না। আমার এই ঋন প্রকৃতি মিটাবে কি করে? আমার সাথে যে অবিচার করা হয়েছে তুমি তার বিচার করো। তবে হে রাষ্ট্র তুমি আমাকে আমার অধিকার থেকে শুধু বঞ্চিতই করো নি, তুমি আমাকে শারিরীক ভাবে বাচিঁয়ে রেখেছো কিন্তু মানসিক ভাবে হত্যা করে ফেলছ। একদিন যেন এর সুবিচার হয়।

November 2026
S S M T W T F
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930