ইন্টারনেট হল বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত আত্মসংযুক্ত ডিভাইস গুলোর মধ্যকার বিভিন্ন ধরনের ডাটা ও মিডিয়া আদান-প্রদানের একটি মাধ্যম। আর ইন্টারনেট বা ডেটা ট্রান্সফারের মূল মাধ্যম হলো ডাটার ট্রান্সমিশন স্পিড ব্যান্ডউইথ। ব্যান্ডউইথের একক হল বিবিএস (বিট পার সেকেন্ড) অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে যে পরিমাণ বিট ট্রান্সফার করা যায় তাকে ব্যান্ডউইথ বলা হয়।
বাংলাদেশের বর্তমানে প্রায় ৬ হাজার জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ প্রতিমিলি সেকেন্ডে ব্যবহৃত হয়। ইন্টারনেটের গতি নির্ভর করে ব্যান্ডউইথ এর প্রতি বা স্পিড এর ওপর। ইন্টারনেটের গতি কয়েকটি স্তরে পরিমাপ করা হয় তা হল, বিবিএস (বিট পার সেকেন্ড), কেবিএস (কিলু বিট পার সেকেন্ড), এমবিপিএস (মেগাবিট প্রতি সেকেন্ড), জিবিপিএস (গিগাবিট অংশ সেকেন্ড),আমরা গ্রাহকরা সাধারণত এমবিপিএস অর্থাৎ মেগাবিট পার সেকেন্ড ইন্টারনেট এর গতি ব্যবহার করে থাকি। আরব আমিরাতে ৪০০ এমবিপিএস ইন্টারনেটের গতি থাকলেও বাংলাদেশ ইন্টারনেটের গর্ভবর্তী পাঁচ থেকে সাত এমবিপিএস। যদিও গ্লোবাল ইনডেক্স ওকলা বলে থাকে বাংলাদেশের গড় ইন্টারনেটের গতি ১৬ এমবিপিএস। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের গতি ১০ এমবিপিএস থাকলেও এক দেশ এক রেটের কারণে এটি নামিয়ে ৫ এমবিপিএস এ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিগত সরকারের তথ্য যোগাযোগ ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী মহান সংসদে দাঁড়িয়ে বলতেন ইন্টারনেটের দাম ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থেকে নামিয়ে ৬০ টাকায় করা হয়েছে। এটি জনগণের সাথে একটি তামাশা প্রহসন এবং মিথ্যাচার করেছেন। কারণ ব্যান্ডউইথের মূল্য বিটিআরসি নির্ধারিত ৩৬৫ টাকা প্রতি জিবিপিএস পার সেকেন্ড। যদিও বেসরকারি আইটিসি আইআইজিদের কাছে বিভিন্ন দামে ব্যান্ডউইথ বিক্রয় করে থাকে। অসম প্রতিযোগিতা এবং সরকারের নির্ধারিত মূল্য না মেনে পাঁচ ছয়টি প্রতিষ্ঠান যারা একদিকে ব্যান্ডউইথ আমদানি করছে, আবার নিজেরা আয় আইজির মাধ্যমে সেই ব্যান্ডউইথ বিক্রয় করছে অন্যদিকে তারা আইএসপির মাধ্যমে গ্রাহকদেরকে সেবা দিচ্ছে। একই প্রতিষ্ঠানের সকল লাইসেন্স এ থাকার কারণে যারা কেবলমাত্র ব্যান্ডউইথ কিনে বিক্রয় করে থাকে তারা অসম বাজার প্রতিযোগিতায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। ঠিক একইভাবে গ্রাহকরা সরকারের নির্ধারিত কিংবা অসম বাজার প্রতিযোগিতার ব্যান্ডউইথের সুফল পাচ্ছে না। বর্তমানে দেশে মোট ব্যবহৃত ব্যান্ডউইথ এর পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার জিবিপিএস। এরমধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান সাবমেরিন ক্যাবলস লিমিটেড সিম ইউ ফোর ও ফাইভ এর মাধ্যমে সরবরাহ করে থাকে ৩৮০০ জিবিপিএস। সিমো সিক্স যুক্ত হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা দাঁড়াবে প্রায় সাত থেকে দশ হাজার জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ সরবরাহের। বর্তমানে ছয়টি বেসরকারি আইটিসি ভারত থেকে আমদানি করে প্রায় তিন হাজার জিবিপিএস। আরো তিনটি বেসরকারি আইটিসি কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছে যারা আগামী বছর অপারেশনে যাবে ফলে বাংলাদেশে সরকারি বেসরকারি মিলে পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার জিবিপিএস এর। এই বিশাল বাজারে সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এর মাধ্যমে যে ব্যান্ডউইথ এর বাজার সৃষ্টি হবে এবং ইতিমধ্যে অসুস্থ বাজার প্রতিযোগিতা চলমান রয়েছে এটি যদি অব্যাহত থাকে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে। যদিও এই ব্যান্ডউইথের বাজার ব্যবস্থাপনায় যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সুফল গ্রাহক পাওয়ার বদলে অসাধু ব্যক্তিরা সুবিধা নিয়ে চলে যাচ্ছে। আবার একই প্রতিষ্ঠানের ট্রান্সমিশন থাকার কারণে তাদের সাথে অন্য প্রতিযোগী ব্যবসায়ী পেরে উঠছে না।
গ্রাহকের সাথে ব্যান্ডউইথ ও ইন্টারনেটের দামের বৈষম্য:
ইতিমধ্যে কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে আমরা লাক্ষ্য করছি যে, প্রতি মোবাইল ইন্টারনেট ডাটা সরবরাহে বের হচ্ছে শোয়া ২ টাকা থেকে ৫ টাকার মত। অথচ বিক্রি হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। বিশাল এই দামের পার্থক্য কেন এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত অপারেটর কিংবা বিটিআরসির পক্ষ থেকে কোন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। যদি এই তথ্য সঠিক হয় তাহলে গ্রাহকদের সাথে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে বলে আমরা মনে করি। এ ধরনের মুনাফা করা কোন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান উচিত নয় আমরা আশা করি খুব দ্রুতই এ ব্যাপারে অপারেটর এবং কমিশনের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা প্রদান করবেন। আমরা যদি ধরে নেই বিটিআরসির রেভিনিউ শেয়ারিং, ভ্যাট, ট্যাক্স, স্পেক্ট্রাম ক্রয়, বিক্রনয়, মার্কেটিং, সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল, ট্রান্সমিশন, শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ, সব যোগ করলেও ইন্টারনেট ডাটার দাম ১৫ টাকার বেশি হতে পারে না। সেখানে ২৫ থেকে ৩০ টাকা দাম সম্পূর্ণভাবে অযৌক্তিক। জনগণের সাথে এই বৈষম্যমূলক দাম পরিহার করতে দ্রুত একটি গন শুনানি আয়োজনের প্রস্তাব করছি।
আইআইজি ওআইটিসি এবং বড় প্রতিষ্ঠান যাদের কাছে এনটিটিএন রয়েছে তাদের সাথে যে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে: একই সাথে ট্রান্সমিশন, ব্যান্ড উইথ আমদানীর জন্য আইটিসি, বিক্রয়ের জন্য আইআইজি, গ্রাহক পর্যায়ে সর্বাধনের জন্য আইএসপি রয়েছে তারা সাবমেরিন কেবল থেকে ৬৫% ব্যান্ডউইথ ক্রয় করার নিয়ম থাকলেও এমনকি বিচার চাই নির্ধারিত মূল্য ৩৬৫ টাকা প্রতি জিবিপিএস হলেও তারা বাজারে ১৫০ থেকে ২০০ টাকায় প্রতি জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ বিত্রনা করে থাকে। অন্যদিকে কেবলমাত্র যার শুধু আইআইটি রয়েছে কিংবা আইএসপি রয়েছে তারা অধিক মূল্যে ব্যান্ডউ ইথ ক্রয় করে বিক্রয় করতে গিয়ে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং বাজার প্রতিযোগিতায় তারা হেরে যাচ্ছেন। ফলে ছোট ছোট বেশিরভাগ আইআইজি এবং আইএসপি ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। যা সম্পূর্ণভাবেই টেলিযোগ নিয়ন্ত্রণ আইনের (২৫) ধারার লঙ্ঘন। অন্যদিকে রাজস্ব ভাগাভাগির আইটিসি গুলো ৩ শতাংশ দিলেও আইআইজির ক্ষেত্রে নির্ধারণ করা হয়েছে দশ শতাংশ।
বিগত সরকারের সময় বিটিআরসির দুজন চেয়ারম্যান শ্যামসুন্দর শিকদার এবং মহিউদ্দিন অনৈতিক আর্থিক সুবিধার গ্রহনের অভিযোগ আছে আয়োজিত
এবং আইটিসি প্রতিষ্ঠানের এমনকি ট্রান্সমিশনের কাছ থেকে। আর যারা দেননি তাদের বিরুদ্ধে গণহারে জরিমানা নোটিশ করেছেন।
আমাদের আজকের এই আলোচনা থেকে শ্যামসুন্দর বাবু এবং মহিউদ্দিনের নেয়া সিদ্ধান্ত পুনঃবিচেনা ও নতুন করে পর্যালোচনার আহ্বান জানাচ্ছি। কারণ ২-৩ জন অপারেটরের শান্তি যাতে না হয় সে কারণেই সবাইকে জরিমানা নোটিশ প্রদান করা হয়েছে বলে আমরা মনে করছি।