• ২৬শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১১ই শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১২ই সফর, ১৪৪৮ হিজরি
আগুনবেলা

“বেসরকারি স্বাস্থ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় চলমান শিক্ষার্থী সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা” শীর্ষক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত মে ২৬, ২০২৪
“বেসরকারি স্বাস্থ্য শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় চলমান শিক্ষার্থী সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা” শীর্ষক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত

“কোয়ালিটি মেইনটেই না করলে কারোই কোন কাজ করা উচিত না। এই কোয়ালিটি শিক্ষণ পদ্ধতি ও হাসপাতাল পরিচালনায়ও চাই। অটোমেশন নতুন কোনো ব্যবস্থা না, এটা পাকিস্তান আমলেও ছিলো। এ পদ্ধতির কারণে অনেকে ভর্তিতে সমস্যা বোধ করছে। আমি নিজেও এটার শিকার। এই অটোমেশনের কারণে আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে পারিনি,” স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী: ডা. রোকেয়া সুলতানা বিপিএমসি’র উদ্যোগে ২৫ মে ২০২৪ তারিখ সকাল ১১.০০ টায় রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে “বেসরকারি স্বাস্থ্য শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং ভর্তি প্রক্রিয়ায় চলমান শিক্ষার্থী সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা” শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন।

প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান এ. কে, আব্দুল মোমেন বলেন, “আমাদের হাসপাতালের ডাক্তারদের কোয়ালিটি ভালো। হাসপাতালের উপর মানুষের আস্থা আনতে হবে, কম্পিটিশন বাড়াতে হবে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে কোয়ালিটি বাড়লে মানুষ এমনি প্রতিদান দিবে।

“আয়োজকরা বলেন, দেশে মেডিকেলে ভর্তিতে অটোমেশন পদ্ধতির কারণে দেশের সকল বেসরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীসহ কলেজ কর্তৃপক্ষকে ইতিমধ্যে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও বিশেষজ্ঞগণ উপস্থিত ছিলেন।

বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশে সরকারের একার পক্ষে সবার চিকিৎসা শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল চিকিৎসা শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি মেডিক্যাল চালু হাওয়ার পর সব সময় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা ভর্তিতে পছন্দমতো মেডিক্যাল কলেজে মেধার ভিত্তিতে সুযোগ পেয়ে আসছিলেন। পূর্বের ভর্তির নিয়ম অনুযায়ী সারা দেশে একসঙ্গে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। এতে শিক্ষার্থীরা পছন্দমতো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারতেন। গত বছর বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির ব্যাপারে বিস্ময়কর পরিবর্তন আনা হয়। মেডিক্যাল শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের নামে সংশ্লিষ্টদের তীব্র বিরোধিতার মধ্যে গত বছর অটোমেশন চালু করা হয়। এই পদ্ধতি চলতি বছর অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ বছর বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে ১ হাজার ২০০ সিট খালি রয়েছে। এমনকি মেডিকেল কলেজগুলোর অর্ধেকেরও বেশি আসনই ফাঁকা থেকে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষাক্ষেত্রের গুরুত্বপূর্ণ এ খাতটি হুমকির মুখে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশন।

বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএমসিএ) সভাপতি এম এ মুবিন খান বলেন, “বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ সেক্টর ধ্বংস করার নীলনকশা করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে—প্রতিষ্ঠান গড়া কঠিন, ধ্বংস করা সহজ। প্রাইভেট সেক্টরে উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীরা নিজের চয়েজমতো ভর্তি হবেন। কিন্তু অটোমেশনের কারণে তারা তা পারছেন না। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সবাই হতাশ। হাত-পা বেঁধে পানিতে সাঁতার কাটতে দেওয়ার মতো অবস্থায় অটোমেশন। যার জন্য এই পেশায় আসতে শিক্ষার্থীরা নিরুত্সাহিত হচ্ছেন। অটোমেশনের নামে এই সেক্টরকে ধ্বংস করার অপপ্রয়াস চলছে।” সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ হাবিবুল হক বলেন,” অটোমেশন পদ্ধতিটি অন্য দেশ থেকে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটি নিজেদের ক্ষেত্রে প্রয়োগের বিষয়ে অন্য দেশের পরিস্থিতি আর আমাদের পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়নি। অন্য দেশে এক আসনের বিপরীতে ১০ জন পরীক্ষা দেয়। সেখানে অটোমেশন প্রয়োজন। আমাদের দেশে তো সে রকম না। এখানে কয়েকটা সিটের বিপরীতে একজন আগ্রহী। “২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষে যেখানে আবেদনের সংখ্যা ছিলো ১৫জন, সাক্ষাৎকারের জন্য অনুপস্থিত ছিলো ১জন। এবং কোনো শুন্য আসন ছিলো না। ২০২৩ থেকে ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে ৪ জনের আসন খালি পাওয়া যায়। একইভাবে কিশোরগঞ্জের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জহুরুল মেডিকেল কলেজের ডাটা অনুযায়ী ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষে আবেদনে আহ্বানের সংখ্যা ১৪জনের হলেও, সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করে মাত্র ১জন। ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষে অস্বচ্ছল কোটায় ভর্তিকৃত শিক্ষার্থী বিগত বছরে ২জন থাকলেও চলতি বছরে এর সংখ্যা শূন্যের কোঠায়। এই চিত্র শুধু মাত্র রাজধানী ঢাকার বেসরকারি মেডিকেল কলেজের নয় বরং বাংলাদেশে সকল জেলার মেডিকেল কলেজের দৃশ্য বটে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলেন, “কিছু অযোগ্য, অদক্ষ ও ঘুষখোর কর্মকর্তার কারণে সরকারকে বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। “বেসরকারি হাসপাতাল অনুমোদনে সবকিছু ফুলফিল দেখেই লাইসেন্স দেওয়া হয়। নিয়মনীতি না মানলে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। সেটা বাস্তবায়ন না করে বেসরকারিতে গুণগত মান নেই—এমন অভিযোগ তুলে অটোমেশন চালু করা হয়। অটোমেশনে বলা হয়েছে, একটা সিটের জন্য পাঁচজন ছাত্র থাকবে। মানে ২৫ হাজার সিরিয়ালের মধ্যে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ভর্তি হতে পারবে। সিরিয়াল নম্বর ৪৯ হাজারের বেশি দিয়েও চলতি বছর এখনো ১ হাজার ২০০ সিট খালি আছে। এই অবস্থা দেখে বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের দাবির মুখে ভর্তির পোর্টাল খুলে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। কিন্তু কেউ যোগাযোগ করে না। বিদেশি শিক্ষার্থীরাও আসছেন না। অথচ অটোমেশন চালু করার আগে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে মেডিক্যালে পড়তে আসতেন শিক্ষার্থীরা। এটা নিয়ে চিকিৎসকদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

বিপিএমসিএ’র সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন তার আলোচনায় বলেছেন, ‘আমাদের দেশের ৯৫ শতাংশ মেডিক্যাল কলেজের মান ও অবকাঠামোগত সুবিধা ভালো। তারপরও সিট খালি আছে। কাজের অভাবে আমরা যারা ব্যাংক ঋণ নিয়ে হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ করেছি, তারা ঋণগুলো শোধ করতে পারি না।’ বিএমডিসি (বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কলেজ কাউন্সিল)’র সহ—সভাপতি অধ্যাপক ড. রওশন আরা বেগম বলেছেন, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের, বিশেষত শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্য কোয়ালিটির প্রশ্নে আপোস নেই। কেননা এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আর সবাই মিলে গাইনি পড়বো বা সার্জারি পড়বো এই ধারা ছাত্র, ছাত্রীদের বদলাতে হবে। মেধানুসারে নানা দিকে যেতে হবে।’ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন তার বক্তব্যে, ‘সরকারী ও বেসরকারী মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালগুলোতে ছাত্র, ছাত্রীদের খুব ভালোভাবে পরীক্ষাগ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে হবে। তাতেই মান তৈরি হবে। প্রেরণা ও পুরষ্কার মান বৃদ্ধি করে। আমাদের শিক্ষক সংকট আছে, কীভাবে তা কাটিয়ে উঠতে পারি, চেষ্টা করে যেতে হবে। ভালো শিক্ষক ও গবেষক নিয়োগ করতে হবে। তাদের ভালো বেতন দিতে হবে। সরকারী ও বেসরকারী ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে। বৃত্তি দিতে হবে।’ পপুলার মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সমস্যা তুলে ধরার জন্য নয়, আমরা সবাই যেন সমাধান করার জন্য কাজ করি।’

উল্লেখ্য যে, চলতি ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষে দেশের ৬৭ টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের দেশী বিদেশী শিক্ষার্থীর ৬২০৮ টি আসনের মধ্যে প্রায় ১০০০ থেকে ১২০০ আসন এখনো শুণ্য আছে।

বাংলাদেশে বেসরকারি চিকিৎসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় চলমান শিক্ষার্থী সংকটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য কি কি করণীয় সে বিষয়গুলি মতবিনিময় সভায় আলোচনা করে একটি রোড ম্যাপ প্রস্তুতপূর্বক তা দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। উক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণকারি অতিথিবৃন্দ ছিলেন সাবেক মুখ্য সচিব, আব্দুল করিম, অধ্যাপক জামালুদ্দিন, সাচিবের সভাপতি, বিশ্ব ব্যাঙ্কের সাউথ আফ্রিকার, হেড অব এডুকেশন, ড. মোখলেসুর রহমান, বিপিএমসির সাধারণ সম্পাদক, ড. আনোয়ার হোসেন খান, এম পি, ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, চেয়ারম্যান, ড. শাহ্‌ মোঃ সেলিম, সংগঠনের সাবেক সভাপতি ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন, সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ হাবিবুল হক, পপুলার মেডিকেল কলেজ – চেয়ারম্যান ড. মোস্তাফিজুর রহমান আদ-দ্বীন উইমেন্স মেডিকেল কলেজ- অধ্যক্ষ ডাঃ মোঃ আফিকুর রহমান, সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডাঃ মোঃ রিফায়েতউল্লাহ শরীফ, মুন্নু মেডিকেল কলেজ অ হাসপাতালের প্রতিনিধি অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজ অ হাসপাতালের ভাইস-চেয়ারম্যান সাইমুম সাইরাস, সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল, অধ্যাপক ডাঃ রওশন আরা বেগম সহ প্রমুখ।