বিআইপি’র উদ্যোগে প্রযুক্তি ‘সংকেত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অগ্রগতি: অপারেশন, পরিকল্পনা এবং নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত
‘Advancing Traffic Management through Signal Control: Operation, Planning and Policy Perspectives’ শীর্ষক সেমিনার
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) আয়োজিত ‘Advancing Traffic Management through Signal Control: Operation, Planning and Policy Perspectives’ শীর্ষক সেমিনার অদ্য ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ (সোমবার) সকাল ১০:৩০ টায় বিআইপি কনফারেন্স হলে অনুষ্ঠিত হয়।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসানের সঞ্চালনায় সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
বিআইপির সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে যেসকল পরিকল্পনা করা হয়, সেখানে পরিকলপনাবিদদের অংশগ্রহণের সুযোগ খুবই সীমিত। এমনকি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ হতে বিভিন্ন পেশাজীবীদের নিয়ে বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট কিংবা পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে কোন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়নি। দেশের টেকসই উন্নয়ন ও সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে অন্যান্য পেশাজীবিদের পাশাপাশি পরিকল্পনাবিদদের জন্য যথাযথ কর্মপরিবেশ ও সুযোগ তৈরি করতে তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে আহ্বান জানান।
পরবর্তীতে সেমিনারের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন- ট্রাফিক্স এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মোঃ আশরাফুল আলম রতন, সিগমাইন্ড এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জনাব আবু আনাস শুভম এবং ট্রান্সপোর্ট প্রফেশনালস অ্যালায়েন্স (টিপিএ) এর প্রধান নির্বাহী এবং ট্রাফিক্স এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডঃ মোহাম্মদ নূরুল হাসান। মূলপ্রবন্ধে বক্তারা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পূর্ববর্তী উদ্যোগসমূহ ও সেখান থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, এবং কীভাবে CITMS (Customizable Integrated Traffic Management System) অতীতের ভুলত্রুটি ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, গুলশান-১ এলাকায় CITMS পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের কেস স্টাডি, এর অন্তর্দৃষ্টি ও ডেটা বিশ্লেষণ এবং অপারেশন, পরিকল্পনা ও নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে উন্নয়নের সুপারিশ নিয়ে আলোচনা করেন।
ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক জনাব ফারুক আহমেদ বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পাশাপাশি আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, CITMS সিস্টেমে যদি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তমূলক উপাদানগুলো অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তবে এটি স্থানীয় ও জাতীয় উভয় স্তরেই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও সহজতর করবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এস এম সোহেল মাহমুদ বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নতির পাশাপাশি নাগরিকদেরও সচেতনতা বৃদ্ধি ও সুশৃঙ্খল আচরণ অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকায় নতুন যানবাহন নিবন্ধনের সুযোগ অব্যাহত থাকলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করা অত্যন্ত কঠিন। আরও বলেন, ঢাকা শহরের মতো দেশের অন্যান্য শহরেও কার্যকর ট্রাফিক সিগনাল ব্যবস্থা চালু ও রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
স্মেক এ কর্মরত পরিবহণ বিশেষজ্ঞ পরিকল্পনাবিদ সৈয়দ মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে CITMS একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। এই সক্ষমতা বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রোড সেফটি, ট্রান্সপোর্ট ম্যানেজমেন্ট এবং সিসিটিভির মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ-এই বিষয়গুলোর ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকা শহরের বর্তমান ‘ট্রাফিক সিগন্যাল সাইকেল’ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘গুড প্র্যাকটিস’ এর তুলনায় বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি সর্বোচ্চ ২-৩ মিনিটে নামিয়ে আনা উচিত।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী জনাব সৈয়দ মইনুল হাসান বলেন, কার্যকরী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য তিন চাকার যানবাহন ও পথচারী সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর সঠিক গবেষণার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এছাড়াও সকল দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে পরস্পর দোষারোপের সংস্কৃতি বন্ধ করা অন্তত্য জরুরি। নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন সহজতর হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সেমিনারের প্রধান অতিথি, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এর নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব), নিলিমা আখতার বলেন, সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলে যেকোন সমস্যা সমাধান সম্ভব। কার্যকরী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব স্পষ্টীকরণ এবং উক্ত ব্যবস্থাপনার অর্থায়ন ও রক্ষনাবেক্ষণে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক) জনাব আবু সুফিয়ান আহমেদ বলেন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাগত দিক থেকে বিআইপি সহ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠন গুলোকে শক্তিশালী ভুমিকা পালন করতে হবে। সকলের সহযোগিতায় ডিএমপি ঢাকা শহরে একটি উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিআইপির সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান সমাপনী বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার যে বাস্তব চিত্র তা থেকে শিক্ষা নিয়েই সঠিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি জন্য স্বতন্ত্র ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার/পরিকল্পনা বিভাগ গঠন করা যেতে পারে। এছাড়াও ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ সুনিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরো বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ও নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ছাড়া কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশের টেকসই উন্নয়ন ও সমন্বিত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠবে বলে আশা ব্যক্ত করেন।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিআইপি’র কোষাধ্যক্ষ পরিকল্পনাবিদ ড. মুঃ মোসলেহ উদ্দীন হাসান, বোর্ড সদস্য পরিকল্পনাবিদ আবু নাইম সোহাগ ও পরিকল্পনাবিদ মোঃ ফাহিম আবেদিন, বিআইপি’র সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ফজলে রেজা সুমন, সাবেক সহ-সভাপতি পরিকল্পনাবিদ ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, পরিকল্পনাবিদ এ কে এম রিয়াজ উদ্দিন, পরিকল্পনাবিদ মোঃ এম.এ. তাহের সহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক ও পেশাজীবীগণ।