প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’ (২৫ মে ২০২৬ হতে ২৫ মে ২০২৭ পর্যন্ত) যথাযোগ্য মর্যাদায় দেশব্যাপী ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উদযাপনের লক্ষ্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জাতীয় কমিটির এক উচ্চপর্যায়ের প্রস্তুতিমূলক সভা আজ মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী জনাব নিতাই রায় চৌধুরী। সভার শুরুতে দেশের ৬৪টি জেলায় প্রতিটি জেলা প্রশাসনের জন্য ২,৫০,০০০/- টাকা এবং ৭৪টি প্রত্যন্ত উপজেলায় প্রতিটির জন্য ১,৫০,০০০/- টাকা করে মোট ২ কোটি ৭১ লক্ষ টাকা ইতিমধ্যে বরাদ্দ প্রদানের বিষয়টি অবহিত করা হয় এবং আগামী ১৮-২০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত দেশব্যাপী ৩ দিনব্যাপী বিশেষ উদ্বোধনী কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে মাননীয় সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, বিগত দিনে কবি নজরুলকে সুপরিকল্পিতভাবে অন্ধকারে নিমজ্জিত করার একটা গভীর অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল। এমন একটি অন্ধকার যুগ আমরা পার করেছি, যে সময় স্বৈরাচারী ও সংকীর্ণ অপশক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তানের দোসর ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী হিসেবে দেখানোর বিকৃত প্রয়াস চালানো হয়েছে। ঠিক একইভাবে, কাজী নজরুল ইসলামকেও এ দেশের মানুষের মন ও স্মৃতি থেকে চিরতরে ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। শহীদ জিয়া এবং জাতীয় কবি—দুজনেই ছিলেন অন্যায্য অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। একজন বিদ্রোহ করেছিলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে, আরেকজন অস্ত্র হাতে গর্জে উঠেছিলেন পাকিস্তানি হানাদারের বিরুদ্ধে। আজ সেই দীর্ঘ অন্ধকার যুগের অবসান ঘটেছে; ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে এক নতুন জাগরণ, একটি সাংস্কৃতিক রেনেসাঁ শুরু হয়েছে। নতুন এই যুগের সূচনাতেই নজরুলই আমাদের সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং সাহসের অনন্য অনুপ্রেরণা।
আজকের প্রস্তুতিমূলক সভায় বছরব্যাপী ‘নজরুল বর্ষ’ পালনের রূপরেখা সাজাতে জাতীয় কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং বিভিন্ন দপ্তরের প্রধানদের পক্ষ থেকে একগুচ্ছ যুগান্তকারী ও বহুমাত্রিক কর্মসূচি প্রস্তাব করা হয়েছে। সভায় বিশ্ববাসীর কাছে ‘নজরুল বর্ষ’-কে তুলে ধরতে বিশ্বখ্যাত ওটিটি প্ল্যাটফর্ম অ্যামাজন (Amazon) ও নেটফ্লিক্স (Netflix)-এ প্রচারের উপযোগী উচ্চমানের প্রামাণ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। এর পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশকে “Land of Nazrul” হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার ধারণা তুলে ধরা হয়, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে যুক্তরাজ্যের “Land of Shakespeare” পরিচিতির মতো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই সাংস্কৃতিক কূটনীতিকে বেগবান করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MoFA) ‘Cultural Diplomacy Wing’-এর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নজরুলের বৈপ্লবিক চেতনা বাংলাদেশের ‘Soft Power’ হিসেবে তুলে ধরা এবং বিদেশের সকল বাংলাদেশি মিশনে বিশেষ আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশে দায়িত্বরত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদেরসহ সবার মাঝে বিতরণের জন্য আন্তর্জাতিক মানের বুকলেট (Booklet) তৈরির পরিকল্পনাও সভার আলোচনায় স্থান পায়।
সভায় নজরুলের ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক সংযোগগুলোকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে তুরস্ককে নিয়ে নজরুলের সাহিত্যকর্মগুলোর সূত্র ধরে তুরস্কে কবিকে বিশেষভাবে প্রমোট করার প্রস্তাব করা হয়। নজরুলের গবেষণামূলক কর্ম ও সাহিত্য বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষায় সমন্বিতভাবে অনুবাদের মাধ্যমে সারা পৃথিবীতে পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাবনা সভায় আলোচিত হয়। এছাড়া আগামী জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বড় পরিসরে ‘নজরুল মেলা’ আয়োজন, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা নজরুল গবেষকদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন এবং দেশব্যাপী নজরুলের জীবনী ও রচনার ওপর বৃহৎ প্রতিযোগিতার প্রস্তাব করা হয়। নজরুলের নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ লেখাসমূহ নিয়ে একটি বিশেষ ‘স্মরণিকা’ প্রকাশের পরিকল্পনাও সদস্যরা সভায় উপস্থাপন করেন।
সভায় তরুণ প্রজন্ম ও দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সম্পৃক্ত করতে দেশব্যাপী ‘Nazrul Talent Hunt’, ডিজিটাল কনটেন্ট প্রতিযোগিতার পাশাপাশি কবির একটি সুনির্দিষ্ট ‘প্রমিত জীবনী’ প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুলের প্রকাশনা সমগ্র নিয়ে বইমেলা আয়োজনের বিশেষ গুরুত্বরোপ করেন। এছাড়া মাসভিত্তিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) কর্তৃক বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত নারী মুক্তিতে নজরুলের অনন্য অবদান নিয়ে কাজ করা, ডিসেম্বর মাসে দেশাত্মবোধক নজরুল সংগীতের বৃহৎ আয়োজন এবং পবিত্র রমজান মাসে নজরুলের কালজয়ী হামদ-নাত নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়। উত্থাপিত এই সকল প্রস্তাবনা যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সভায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জনাব আলি নেওয়াজ মাহমুদ খেয়ম এমপি ও মন্ত্রণালয়ের সচিব মিজ্ কানিজ মওলাসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকবৃন্দ এবং দেশের বরেণ্য নজরুল গবেষক ও জাতীয় কমিটির সম্মানিত সদস্যবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।