ইতিহাস বিজয়ীর হাতে লিখা হয়। বিজয়ী দল তাদের প্রয়োজন মতো সংযোজন বিয়োজন করে। কিন্তু অনেক সময় লোকে বিজয়ী চেয়ে পরাজিতদের বেশি স্মরণ করে। ভালোবাসে, সম্মান করে, নিজেদের বীর বলে স্মরণ করে।কেবল বিজয়ী হওয়া নয়, হেরে যাওয়াও হতে পারে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়ার উপায়। যদি না সেই হারের ভেতরও থাকে লড়াই, হেরে না যাওয়ার মানসিকতা, দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, পেশাদারিত্ব আর মানুষের ভালোবাসা। সত্যের জন্য লড়াই করে জীবন দিয়েছে বলে মনে করে। এরা সেই সকল পরাজিত বীর। আজ এমন কয়েকজন পরাজিত বীর সৈনিকের কথা লিখবো।
১.নবাব সিরাজুদ্দৌলাঃ বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব।যার পরাজয়ের সাথে সাথে অস্তমিত হয় স্বাধীনতার সূর্য। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় বিশাল বাহিনী নিয়েও পরাজিত হতে হয় ব্রিটিশ বেনিয়া বাহিনীদের হাতে।শেষ শক্তি দিয়েও যুদ্ধ করে পরাজয় এড়াতে পারেন নি নবাব ও তার বাহিনী। যদিও তিনি হেরেছেন কিন্তু আজও তিনি বাঙালির হৃদয়ে নবাব।
২.জালাল আদ-দিনঃ মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে প্রথম বিজয় লাভ করেন খাওয়ারিজম শাহ সুলতান জালাল উদ্দীন। তার সঙ্গে ছিলে দুুুুুর্ধর্ষ তুর্কি সেনাপতি তিমুর মালিক। পারওয়ান উপত্যকায় মোঙ্গলদের এনে কচুকাটা করেন তিমুর ও সুলতান। কিন্তু ভুল বোঝাবুঝি তাদের জন্য কাল হয়ে দাড়ায়। যুদ্ধে গনিমত হিসেবে পাওয়া আরবি ঘোড়া নিয়ে তিমুর মালিক ও জালাল উদ্দীনের সৈন্যদের সংগর্ষ হয়। অল্প কিছুদিনের মাথায় জালাল উদ্দীন ও পরাজিত হোন চেঙ্গিস খানের হাতে। হারের পর জালাল-আল-দীন পালিয়ে যান। ১২৩১ সালে তুরস্কের দিয়ারবাকিরে জালাল-আল-দীন মৃত্যুবরণ করেন। তবে তার মৃত্যু নিয়ে সঠিক তথ্য কেউ দিতে পারেননি।
৩.শহীদ তিতুমীরঃ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রনী সেনাপতি। প্রথম বাঙালি শহীদ। যিনি তিতুমীরের বাঁশেরকেল্লার জন্য বেশি পরিচিত। দেশ স্বাধীনের জন্য জীবনের শেষ রক্ত দিয়ে লড়াই করেন। ১৮৩১ সালের ২৩শে অক্টোবর বারাসতের কাছে বাদুড়িয়ার ১০ কিলোমিটার দূরে নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে তারা বাঁশের কেল্লা তৈরি করেন। বাঁশ এবং কাদা দিয়ে তারা দ্বি-স্তর বিশিষ্ট এই কেল্লা নির্মাণ করেন। যাতে কৃষকসেনা সংখ্যা ছিলো প্রায় ৮৩০০০ জন। ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিতুমীর স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন, “ভাই সব, একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আক্রমণ করবে। লড়াইতে হার-জিত আছেই, এতে আমাদের ভয় পেলে চলবে না। দেশের জন্য শহীদ হওয়ার মর্যদা অনেক। তবে এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়। আমাদের কাছ থেকে প্রেরণা পেয়েই এ দেশের মানুষ একদিন দেশ উদ্ধার করবে।১৪ নভেম্বর তিতুমীর কর্নেল হার্ডিং ও তার বাহিনীর সাথে যুদ্ধে শহীদ হন।
৪.সুলতান বায়েজিদঃ ওসমানী সাম্রাজ্যের ইতিহাসে ১ম বায়েজিদ ছিলেন একজন র্দুধর্ষ ও বেপরোয়া শাসক। যার হুঙ্কারে ক্রুসেডারদের দুর্গ কেপে উঠতো। বায়েজিদ জীবনে একটি যুদ্ধে পরাজিত হয়েছেন। আর তা আরেক র্দুদর্ষ মোঙ্গল শাসক তৈমুর লং এর বিরুদ্ধে। যুদ্ধ শুরু হয়েছিলো ১৪০২ সালের ২৮ জুলাই সকালে আঙ্কারায়। এ যুদ্ধে ওসমানীয়দের পরাজয় ঘটে। বন্দি হন বায়েজিদ ও তার ছেলে মুস্তফা সেলেবিও। নিজে না পালিয়ে ছেলেদের তিনি পালিয়ে যেতে বলেন। তারা তাই করে। কিন্তু তৈমুর তার উত্তরসুরীদের নিয়ে যুদ্ধ করেন। এ যুদ্ধে তার কয়েক জন যোগ্য উত্তরসূরী মারা যান। পরবর্তীতে তৈমুর সাম্রাজ্য তেমন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে নাই। বায়েজিদ বন্দি হবার পর শুরু ওসমানীদের গৃহ যুদ্ধ। একদশক তা স্থায়ী ছিলো। পরে প্রথম মোহাম্মদ সিংহাসন আহরণ করেন। যুদ্ধে জয়ী হয়েও তৈমুর বংশ প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়৷ কিন্তু ওসমানীয় আবারও পুরনো রুপে কয়েক বছর পর হাজির হয়।
৫.ওমর মুখতারঃ লিবিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক মুজাহিদ মরুসিংহ ওমর মুখতার। ১৯১২ সাল থেকে শুরু করে প্রায় বিশ বছর তিনি লিবিয়ায় ইতালীয় ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ১৯৩১ সালে তিনি ইতালীয়দের হাতে গ্রেপ্তার হন এবং তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
৬.সাইয়্যেদ কুতুব শহীদঃ মিশরের ইসলামি আন্দোলনের বীর সেনা। যিনি স্বপ্ন দেখতেন কোরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করার। তাকে মিসরের সৈরশাসক জামাল আবদেল নাসের সরকার হত্যা করে। রাষ্ট্রপতি হত্যা চেষ্টা মামলা দিয়ে ১৯৬৬ সালের আগস্ট মাসে সাইয়েদ কুতুব ও তার দু’জন সাথীকে সামরিক ট্রাইবুনালের পক্ষ থেকে মৃত্যুদন্ডাদেশ শুনানো হয়। ২৫শে আগস্ট, ১৯৬৬ সালে ঐ দন্ডদেশ কার্যকর করা হয়।
৭.টিপু সুলতানঃ ইতিহাসে প্রথম রকেট আর্টিলারি তৈরী ও ব্যবহার করেন। তিনি ছিলেন মহীশূর রাজ্যের শাসক। ১৭৯৯ সালে টিপু সুলতান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে যুদ্ধ করেন।সেনাপতি মীর সাদিকের বিশ্বাসঘাতকতা এযুদ্ধে পরাজয় ঘটে ও টিপু সুলতান শহীদ হন। তার মৃত্যু হলে সমগ্র উপমহাদেশের ক্ষমতা প্রায় চলে যায় ব্রিটিশ দের হাতে।
৮.সাইয়েদ আহমদ বেরলভীঃ ১৮৩১ সালের ৬ মে ঐতিহাসিক বালাকোট প্রান্তরে ইংরেজ ও শিখ মিত্র বাহিনীর সাথে জিহাদ করে এক অসম যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের আযাদি আন্দোলনের অকুতোভয় সিপাহসালার, ঈমানি চেতনার প্রাণপুরুষ, ইমামুত তরিকত, যামানার শ্রেষ্ট মুজাদ্দেদ এবং যুগের শ্রেষ্ট বুজুর্গ ও পীর, অলিয়ে কামেল, আমীরুল মু’মিনীন হযরত সাইয়েদ আহমদ শহীদ বেরলভী (রহ.) এবং তার কতিপয় সহযোদ্ধা। তার শাহাদত ছিল ব্রিটিশ এবং তাদের মিত্র শিখদের অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তৎকালীন ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের অন্ধ্র প্রদেশ থেকে শুরু করে মর্দান পর্যন্ত এ বিশাল অঞ্চলে তিনি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ইসলামী শাসনব্যবস্থা চালু করেন।
চলবে…